চুক্তি সইয়ের সব কাজ শেষ, বিস্তারিত আসছে: ট্রাম্প

দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি সই হয়েছে। সোমবার, ফ্রান্সের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই ঐতিহাসিক চুক্তির ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, চুক্তি সইয়ের কাজ পুরোপুরি শেষ। তিনি আরও জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপস্থিত থাকবেন।

এই প্রাথমিক চুক্তির আওতায় ইরান কর্তৃক অবরুদ্ধ কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হবে এবং আগামী ৬০ দিনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে দুই দেশের কূটনীতিকরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করবেন। এই চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম গত ১০ মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের মোট সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এবারের যুদ্ধে মূলত ইরান ও লেবাননে ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল। ফলে এই চুক্তিকে শান্তি ফেরানোর সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Iran War 09
চুক্তির আড়ালে ইরান যা পাচ্ছে এবং আমেরিকার ব্যর্থতা:
যদিও এই চুক্তির সব তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, চুক্তির শর্ত মেনে চললে ইরান বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানি তহবিল অবমুক্ত করা এবং উপসাগরীয় ধনী মিত্র দেশগুলোর অর্থায়নে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল ‘পুনর্গঠন তহবিল’ গঠন করা।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সুবিধা পেতে হলে ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার মার্কিন শর্ত পূরণ করতে হবে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর থেকে সমর্থন চিরতরে প্রত্যাহার করতে হবে। আগামী দুই দিনের মধ্যে চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।

Iran War 08
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলকে সাথে নিয়ে ইরানের ওপর আকস্মিক বিমান হামলা চালিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে চেয়েছিলেন, তার প্রায় কিছুই তিনি পারেননি। ইরানের থিওক্র্যাটিক বা ধর্মীয় সরকার এখনও বহাল তবিয়তে ক্ষমতায় রয়েছে।

এমনকি তেহরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা কিংবা হিজবুল্লাহকে নিষ্ক্রিয় করার মার্কিন দাবিও অপূর্ণই রয়ে গেছে। এছাড়া ইরানের ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ কী হবে, তাও এই চুক্তিতে স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আমেরিকার বিন্দুমাত্র নতি স্বীকার করেননি।

হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, ৬০ দিন কোনো রকম টোল বা ফি ছাড়াই এই আন্তর্জাতিক রুট দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করবে এবং চূড়ান্ত চুক্তিতেও এই শর্ত থাকবে। তবে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, ওমানের সাথে যৌথভাবে এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তারা নিজেদের হাতেই রাখবে।

Iran War 07
ট্রাম্পের চুক্তিতে নেতানিয়াহুর চরম অসম্মতি:  
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো লেবাননে ইসরাইল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যেই লেবাননের ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইরান দাবি করেছে, এই চুক্তির মূল শর্তই হলো লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন সম্পূর্ণ বন্ধ করা। কিন্তু ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই দাবিকে ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে হুংকার ছেড়ে বলেছেন, ইরান চেয়েছিল আমরা দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করি, কিন্তু আমি নিজের অবস্থানে অনড় ছিলাম।

তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননেই অবস্থান করবে এবং হিজবুল্লাহর যে কোনো হামলার পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের থাকবে। একই সাথে ট্রাম্পের সাথে এই যুদ্ধ নিয়ে তাঁর যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে, সেটিও তিনি অকপটে স্বীকার করেন।

অবশ্য এক মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করা এই চুক্তির কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত ছিল না। এদিকে চুক্তি ঘোষণার পর যুদ্ধ কিছুটা থিতিয়ে এলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের কফার তিবনিত শহরে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় এক গাড়ি চালক নিহত হয়েছেন।

Iran War 06
নেতানিয়াহুও দাবি করেছেন, তাদের সেনারা চারজন ‘জঙ্গিকে’ খতম করেছে। এর বিপরীতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইসরাইলি হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

ভেতরের খবর হলো, ইসরাইলি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এই চুক্তিকে একেবারেই মেনে নিতে পারছেন না। রয়টার্সের কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসরাইলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এই চুক্তিটি ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিপজ্জনক।

প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে পুরো ইসরাইল এই চুক্তিকে নিজেদের পিঠে ছুরি মারার শামিল বলে মনে করছে। ওয়াশিংটন আর তেহরানের এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে আসলেই শান্তির সুবাতাস আনবে, নাকি ইসরাইলের জেদের কারণে চুক্তিটি ভেস্তে যাবে, তা আগামী দিনগুলোতেই পরিষ্কার হবে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স