মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত রবিবার তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে একযোগে এই হামলা চালায় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ আবারও সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে।
এই আকস্মিক সহিংসতা গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সই হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরও ৬০ দিনের আলোচনার যে পথ তৈরি হয়েছিল, এই পাল্টাপাল্টি হামলায় তা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। হরমুজের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইরান বেশ কিছুদিন ধরেই বাণিজ্যিক জাহাজে বাধা সৃষ্টি আসছিল, তবে রোববারের এই হামলাটির পরিধি ও তীব্রতা পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
এবারের ইরানি হামলা কাতার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যা যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ এবং গত এপ্রিলের পর কাতারে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, মে মাসের শুরুর পর এই প্রথম তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের দিক থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বেসামরিক নাবিক এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে রবিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে নতুন করে হামলা শুরু করেছে। সেন্টকমের মুখপাত্র টিম হকিন্স সিএনএন’কে জানান, মার্কিন যুদ্ধবিমান একটি ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি আত্মঘাতী ড্রোন ভূপাতিত করেছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আমরা ওদের রীতিমতো পিটিয়ে তছনছ করে দিচ্ছি।
অন্যদিকে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি সমৃদ্ধ বন্দর নগরী সিরিক, বন্দর আব্বাস এবং কাছাকাছি কুশম দ্বীপের চারপাশে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ‘আগ্রাসী’ মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালী ও ট্রানজিট রুট ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের মাস্কাটে শনিবার যে আলোচনা চলছিল, তা মূলত মার্কিন ‘দৃশ্য ও অদৃশ্য’ চাপের কারণে কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়েছে।
ইতিমধ্যে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি চুক্তি সমাপ্ত বলে ঘোষণা করলেও আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন। ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্সে লিখেছেন, একতরফা চুক্তির দিন শেষ। আমরা বলেছিলাম কথা রাখুন, নয়তো মূল্য চুকান। বাস্তবতার মুখোমুখি হোন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে মার্কিন জোটের শুরু করা এই যুদ্ধ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। প্রণালীতে ইরানের এই কার্যকর অবরোধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে, যা বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের (পেট্রোল) দাম বৃদ্ধি আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধপূর্ব সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান এখন সেখানে স্থায়ী ফি আদায়ের ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে এবং তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে যাতায়াত না করতে সতর্ক করেছে। শনিবার রাতে একটি অননুমোদিত রুট দিয়ে যাওয়া জাহাজে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ার পর প্রণালীটি বন্ধের ঘোষণা দেয় ইরান। রবিবার তারা আরও একটি বাণিজ্যিক জাহাজ অকেজো করার দাবি করেছে।
ওমান উপকূলে কনটেইনারবাহী জাহাজ ‘জিএফএস গ্যালাক্সি’তে হামলার পর এক ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে, তবে ওমান কর্তৃপক্ষ ২৩ জন ক্রু মেম্বারকে উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছে। কাতার তাদের সব ধরনের মাছ ধরার নৌকা ও জলযানকে চলাচল স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ইরানের নবগঠিত ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর বেআইনি কর্মকাণ্ডের কারণে প্রণালী দিয়ে এই মুহূর্তে যাতায়াত সম্ভব নয় এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে নতুন করে পারমিট ইস্যু করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ইরানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ট্রাফিক স্বাভাবিক রয়েছে এবং নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় মার্কিন বাহিনী নিয়োজিত আছে। মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার জানিয়েছে, চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ওমানের কাছাকাছি একটি বর্ধিত দক্ষিণ রুট দ্বি-মুখী ট্রাফিকের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, গত তিন রাতে তারা ইরানের ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুসহ এই সপ্তাহে মোট ৩০০টিরও বেশি ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে।
এর জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ডস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা মার্কিন মিত্র জর্ডানে একটি কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার ও ড্রোন হ্যাঙ্গার ধ্বংস করেছে, কুয়েতে মার্কিন রাডার সাইট ও রকেট লঞ্চার সিস্টেমে আঘাত হেনেছে, ওমানে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর লজিস্টিক প্ল্যাটফর্মে আক্রমণ করেছে এবং কাতারে একটি মার্কিন জেট রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ধ্বংস করেছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকাশ থেকে পড়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছেন। এই হামলার জন্য ইরান সম্পূর্ণ আইনত দায়ী বলে কাতার উল্লেখ করেছে এবং তারা আর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এছাড়া বাহরাইন বেশ কয়েকটি ইরানি ড্রোন প্রতিহত করেছে, জর্ডান ও ওমান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা জানিয়েছে এবং কুয়েতের একটি তেলক্ষেত্রে হামলায় একজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। ওমান এই হামলার প্রতিবাদে ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে এবং মাস্কাটের মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স-আল জাজিরা