ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের টানা দুই সপ্তাহের ভারী বিমান হামলা আকস্মিকভাবে স্থগিত করার মাত্র দুদিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার সৌদি আরব, জর্ডান এবং উত্তর ইরাকে একাধিক ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে তেহরান ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ কৌশল পরিবর্তনের পরীক্ষা নিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সময়ে তেহরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করায় ৬টি আন্তর্জাতিক জাহাজকে ফেরত পাঠিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদ এবং তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো একাধিক ড্রোন তারা সফলভাবে ভূপাতিত করেছে। রিয়াদ দাবি করেছে, ইরাকভিত্তিক ইরান সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এসব ড্রোন উৎক্ষেপণ করেছে এবং এর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে।
আলাদাভাবে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরের প্রধান তেল বন্দরে জ্বালানি পরিবহনকারী কৌশলগত রুটে হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনি আকাশসীমায় সৌদি ড্রোনের অনুপ্রবেশের প্রতিশোধ হিসেবেই এই আঘাত বলে দাবি তাদের। এছাড়া জর্ডান দুটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা নিশ্চিত করেছে এবং উত্তর ইরাকে অবস্থানরত ইরানবিরোধী কুর্দি বাহিনীর ওপর ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ট্রাম্পের অভিযান স্থগিত ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়া: যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ রাতের বিমান হামলা বন্ধের সিদ্ধান্তের পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে ব পতন ঘটেছে। গত সপ্তাহে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলেও সোমবার তা প্রায় ৬.৫% কমে ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ সামরিক কমান্ডাররা ট্রাম্পকে পরামর্শ দেন, ইরানে কার্যকর সামরিক লক্ষ্যবস্তু ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে এবং বিমান প্রতিরক্ষা গোলাবারুদের সংকট দেখা দিচ্ছে। এরপরই ট্রাম্প অভিযান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন। দুই সপ্তাহের এই হামলায় ইরানে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি অবকাঠামো ধ্বংস হয়, যার জবাবে ইরানি হামলায় চারজন মার্কিন সেনা নিহত হন।
দরকষাকষির জন্য চাপাচাপি করবে না ইরান: জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ দাবি করেন যে, আলোচনার পথ সুগম করতে ট্রাম্প হামলা বন্ধ করেছেন এবং ইরান চুক্তির জন্য আকুতি জানাচ্ছে। তবে এই দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কিছু বার্তা লেনদেন হলেও আমেরিকার কাছে শান্তি আলোচনার পুনরারম্ভের জন্য কোনো আবেদন জানানো হয়নি। "ইরান দরকষাকষির আবেদন করছে, এমন খবর সম্পূর্ণ ভুয়া। এটি আমাদের ডিএনএ-তেই নেই, সোজা জানিয়ে দেন তিনি।
হরমুজ প্রণালীতে তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ: ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সোমবার সকালে তেহরানের অনুমতি ছাড়া প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করা ছয়টি জাহাজকে ফিরিয়ে দিয়েছে ইরানি বাহিনী, যার মধ্যে একটি যান দুর্ঘটনার শিকার হয়।
যুক্তরাষ্ট্র জাহাজগুলোকে ওমান উপকূলের পথ ব্যবহার করতে বললেও, ইরান স্পষ্ট করেছে যে কেবল তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন উপকূলীয় পথ দিয়েই জাহাজ চলাচল করতে পারবে এবং সেখানে তারা ট্রানজিট ফি আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রণালীর ওপর নিজেদের সার্বিক কর্তৃত্ব আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে বর্তমানে ওমানের প্রতিনিধি দলের সাথে ইরানের আলোচনা চলছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স