ইরান জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ওমানের সাথে একটি নতুন নৌ-চ্যানেল রুট চূড়ান্ত করার চুক্তি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে একই সাথে ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামরিক হুমকি বন্ধ এবং হামলার ক্ষতিপূরণ না দেয়া পর্যন্ত এই কৌশলগত জলপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। সংঘাতের পূর্বে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই চ্যানেল দিয়েই পরিবাহিত হতো। দীর্ঘ অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে।
তেহরানে এক সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই জানান, হরমুজ দিয়ে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে ওমানের সাথে আলোচনা অত্যন্ত গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে শিপিং রুটের মানচিত্র চূড়ান্ত হয়েছে এবং কিছু প্রযুক্তিগত বিষয় যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। এই আলোচনায় সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অপরাধ দমনের মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার জন্য ইরান সার্ভিস ফি বা অর্থ দাবি করতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রবিবারে নিশ্চিত করেন যে, ওমানের সাথে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত না মানা পর্যন্ত এই প্রণালী খোলা হবে না। তিনি স্পষ্ট করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না এবং গত জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি ভঙ্গ করায় আপাতত সরাসরি আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। বর্তমানে কেবল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই বার্তা আদান-প্রদান করা হচ্ছে।
ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বিদায়ী সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য বেশ কিছু জোরালো দাবি পেশ করেছেন; এসব হলো ইরান ও তার মিত্র দেশগুলোতে (লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাক) মার্কিন হামলা ও আগ্রাসন চিরতরে বন্ধ করা।
পারস্য উপসাগরে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া। ইরানের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া। মার্কিন আক্রমণের ফলে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
এদিকে, ইরান সম্প্রতি ঘোষণা করেছে আইআরজিসির সাবেক প্রধান ট্রাম্প-বিরোধী হিসেবে পরিচিত মোহসেন রেজাইকে নিরাপত্তা পরিষদের দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের অবস্থান ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন ইরান ইস্যুতে অনেকটা ধীরগতির নীতি অবলম্বন করছে। তিনি বলেন, আমরা তাদের সাথে আধা-আলোচনা চালাচ্ছি। ইরানে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি ও অর্থের অভাব আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। তবে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজ দেশে যুদ্ধবিরোধী চাপের কারণে ট্রাম্প সংঘাত দ্রুত শেষ করার তাগিদ অনুভব করছেন।
গত জুনে দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় ইরানি জাহাজের ওপর অবরোধ জারি করায় তা ভেস্তে যায়। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলে যুক্তরাষ্ট্রও বন্দর অবরোধ তুলে নেবে।
বর্তমান অনিশ্চয়তার মধ্যেও অপরিশোধিত তেলের দাম আবার বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৪.২২ ডলারে পৌঁছেছে। গত এপ্রিলের শেষে এই অপরিশোধিত তেলের দাম ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ ব্যারেল প্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল।
হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণ: হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনার মাঝেই লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা জোরদার করেছে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধের ডাক দিয়ে লোহিত সাগরে তারা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
সোমবার ইয়েমেনের লোহিত সাগর তীরবর্তী বন্দর নগরী মোখায় হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলায় ৭ জন সামরিক ও সাধারণ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইয়েমেনি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা হুথিদের ১১টি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
ইরান ও ওমানের চুক্তিটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শর্তাবলির জটিলতায় হরমুজ প্রণালী কবে নাগাদ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে এখনও গভীর ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স