যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও সম্ভাব্য আলোচনাকে কেন্দ্র করে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে, দেশটির উদারপন্থীদের সঙ্গে স্নায়ু লড়াইয়ে নেমেছে কট্টরপন্থীরা। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যে কোনো ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতার বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান নিয়েছে দেশটির আলোচনাবিরোধী কট্টরপন্থী গোষ্ঠী ‘ফ্রন্ট অব ইসলামিক রেভল্যুশনারি স্ট্যাবিলিটি’ বা ‘পায়দারি ফ্রন্ট’।
এমনকি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি রক্ষায় প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন উদারপন্থী ও মধ্যপন্থী শিবির যখন আলোচনার পক্ষে জোর দিচ্ছে, তখন কট্টরপন্থীরা তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে ইরান এক মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়াসহ তেল ও জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং দুই পক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।
যুদ্ধের এই প্রেক্ষাপটেই তেহরানের নীতিনির্ধারণী মহলে তৈরি হয়েছে দুই মেরু। একদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের উদারপন্থী শিবির কূটনৈতিক উপায়ে যুদ্ধের অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছে; অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা স্লোগান তুলেছে, ‘আপস নয়, আত্মসমর্পণ নয়- আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই চাই’ এবং ‘শত্রুর সঙ্গে আলোচনা মাতৃভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’।
পায়দারি ফ্রন্টের ঘনিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্য আমির হোসেন সাবেতির মতে, বিশ্ব কেবল শক্তির ভাষাই বোঝে এবং দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনা হতে পারে না। এই কট্টরপন্থী গোষ্ঠীটি জাতিসংঘে অংশ নেওয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে অভিশংসনের প্রস্তাব পার্লামেন্টে জমা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেয়া ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করার একটি আইন নিয়েও কাজ করছে তারা, যা কট্টরপন্থীদের রাজনৈতিক প্রভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কট্টরপন্থীরা যতই রাজপথে বিক্ষোভ বা পার্লামেন্টে চাপের সৃষ্টি করুক না কেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার একক ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মতো সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে কট্টরপন্থীরা তা পুরোপুরি ঠেকাতে পারবে না।
অতীতে বারাক ওবামার আমলেও পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) ঠেকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল এই গোষ্ঠীটি। বর্তমানে একদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিশংসন নিয়ে টানাপোড়েন এবং অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা, সব মিলিয়ে তেহরানের রাজনীতিতে উদার ও কট্টরপন্থীদের এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা