বিগত ২০১৯ সালের জুনে ওমান উপসাগরে একটি বাণিজ্য জাহাজে হামলার পর শুরু করা ‘অপারেশন সংকল্প’র অধীনে ভারতীয় নৌবাহিনী ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে আরব সাগরে ১৮টি উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে।
ভারতের নৌবাহিনী ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে সমুদ্রপথে, বিশেষ করে লোহিত সাগরের করিডোরে, ইসরাইল-হামাস সংঘর্ষের পর থেকে বেড়ে যাওয়া জলদস্যুতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত অভিযান চালাচ্ছে। এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত কার্গো এবং তেল ট্রানজিট পয়েন্টগুলির মধ্যে একটি।
ভারতীয় নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চের মধ্যে কমপক্ষে ১৮টি ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ‘প্রথম মোকাবেলাকারী’ এবং ‘পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার’ হিসাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এ সময়কালে তারা এ জলপথে জলদস্যু আক্রমণের হুমকি ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে মোকাবেলা করে নৌবাহিনী বিভিন্ন দেশের সাহায্যে এসেছিল।
যেভাবে ভারতের নৌবাহিনী একটি জলদস্যু জাহাজ উদ্ধার করেছে
জলদস্যুরা ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর মাল্টার পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ এমভি রুয়েন ছিনতাই করে। জাহাজে থাকা ক্রুরা জাহাজটি জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগে আগে একটি এসওএস পাঠালে তাৎক্ষণিক ভারতের নৌবাহিনী এটিকে ট্র্যাক করা শুরু করে। তারা দেখেছিল, ছয় জলদস্যু অবৈধভাবে জাহাজটিতে চড়েছে।
এর পরপরই দখল করা জাহাজটিকে শনাক্ত এবং সহায়তার জন্য এডেন উপসাগরে জলদস্যুতা বিরোধী টহলদারিতে একটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে ভারতীয় নৌবাহিনী।
শীঘ্রই জানা যায় যে জাহাজের একজন ক্রু আহত হয়েছে। এরপর নৌবাহিনী একটি উদ্ধার অভিযান শুরু করে এবং চারদিনের মধ্যে জাহাজ থেকে আহত নাবিককে সরিয়ে নিয়ে তাকে চিকিৎসার জন্য ওমানে পাঠায়।
যাহোক, জলদস্যুরা এমভি রুয়েনের নিয়ন্ত্রণ সুরক্ষিত রাখে এবং এটিকে সোমালিয়ান উপকূলের দিকে নিয়ে যায়।
তারপর থেকে, লোহিত সাগরের পূর্বে জাহাজগুলিকে সহায়তা করার জন্য এডেন উপসাগর এবং উত্তর আরব সাগরে কমপক্ষে এক ডজন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশের নৌবাহিনী ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে এ জলপথ সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছে।
ছিনতাইয়ের পর থেকে ভারতের নৌবাহিনী এই অঞ্চলটি ‘নিরবিচ্ছিন্ন নজরদারি কার্যক্রম’র অধীনে রাখে। তথ্য সংগ্রহ করতে এবং অঞ্চলটি পর্যবেক্ষণ করতে এরিয়াল প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য জাহাজ ব্যবহার করে।
তিন মাসের বেশি সময় পর ব্রিটিশ মেরিটাইম সিকিউরিটি ফার্ম অ্যামব্রে থেকে তথ্য আসে, এমভি রুয়েনকে ১৪ মার্চ সোমালি উপকূলে দেখা গিয়েছিলো ।
জলদস্যুরা অন্যান্য জাহাজ আক্রমণ করার জন্য বাল্ক ক্যারিয়ারটিকে মাদারশিপে রূপান্তরিত করেছিলো। ১৫ মার্চ ভারতীয় নৌবাহিনী এটিকে আটকের জন্য তাদের যুদ্ধজাহাজ আইএনএস কলকাতাকে পুনরায় মোতায়েন করে। আইএনএস কলকাতা দুই হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করে এবং পরেরদিন সকালে জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে থাকা জাহাজটিকে কোণঠাসা করে ফেলে।
এর চল্লিশ ঘণ্টা পরে নৌবাহিনী ৩৫ সোমালি জলদস্যুকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে এবং ছিনতাই করা জাহাজে জিম্মি থাকা ১৭ জন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করে।
উচ্চঝুঁকির এই অপারেশনে একাধিক নৌবাহিনীর জাহাজ, ড্রোন, বিমান এবং মেরিন কমান্ডোরা অংশ নিয়েছিলেন।
আইএনএস সুভদ্রা টহল জাহাজ, হাই অল্টিটিউড লং এন্ডুরেন্স (HALE RPA) ড্রোন, এবং পি৮আই সামুদ্রিক টহল বিমান আইএনএস কলকাতাকে জলদস্যু জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিতে সাহায্য করার জন্য উদ্ধার অভিযান বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।
জলদস্যুদের আটক করতে এবং ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আট মেরিন কমান্ডোর (MARCOS PRAHARs) একটি স্কোয়াডকে একটি সি-১৭ বিমানের মাধ্যমে জাহাজে নামানো হয়। দুঃসাহসী এ অপারেশনের সময় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পাকিস্তানি জেলেদের উদ্ধারে ভারতীয় নৌবাহিনী
আইএনএস কলকাতার অপারেশনের কয়েকদিন পর, নৌবাহিনী ছিনতাই করা ইরানি মাছ ধরার জাহাজ ‘আল-কাম্বার ৭৮৬’ থেকে ২৩ জন পাকিস্তানি নাগরিককে উদ্ধার করে।
আইএনএস সুমেধা ২৯ মার্চের প্রথম প্রহরে মাছধরার জাহাজটিকে আটক করে এবং পরবর্তীতে নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র ফ্রিগেট আইএনএস ত্রিশূলের সাথে যোগ দেয়।
ভারত মহাসাগরে ইয়েমেনের একটি দ্বীপ সোকোত্রার আনুমানিক ৯০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ২৮ মার্চ ৯ সশস্ত্র জলদস্যু জাহাজটিতে চড়ার আগে আগে জাহাজটি থেকে একটি আক্রান্ত হবার কল পাঠানো হয়েছিল।
১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ‘তীব্র দমনমূলক কৌশলগত পদক্ষেপ’র পর, নৌবাহিনী ছিনতাই করা মাছধরা জাহাজে থাকা জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে এবং ২৩ জন পাকিস্তানি ক্রুকে নিরাপদে উদ্ধার করে।
২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানের ১০০ দিনে নৌসেনা ৪৫ জন ভারতীয়সহ ১১০ জনের প্রাণ বাঁচিয়েছে। এ সময়কালে ৯০টিরও বেশি ঘটনা ঘটেছে সমুদ্রে, যার মধ্যে ৫৭টি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা হামলা হতে দেখা এবং ৩৯টি জলদস্যুতা, ছিনতাই, এবং নভেম্বরের মধ্যে সন্দেহজনক গতিবিধির ঘটনা রয়েছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি।