গণ-আটক: অভিজিৎ ও ধ্রুব রাঠিকে ছাড়া বাকি সবাইকে মুক্তি!

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) যন্তর মন্তর অভিমুখে বিশাল অভিযানকে কেন্দ্র করে শনিবার দিনভর রণক্ষেত্র ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করেছে রাজধানী দিল্লিতে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মারাত্মক কারচুপির অভিযোগে ডাকা এই বিক্ষোভ ঠেকাতে পুরো দিল্লিতে নজিরবিহীন সেনা মোতায়েন ও গণ-আটক অভিযান চালায় পুলিশ।

আম আদমি পার্টির (আপ) অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিপিআইএমের পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকারসহ চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এবং তিন হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে আটক করা হলেও শনিবার রাত ১২টার পর একে একে প্রায় সকলকেই ছেড়ে দেয়া হয়। তবে, গভীর রাতেও পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে সিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে।

CJP Leader Arrest 1
মুম্বাই থেকে উড্ডয়ন করে দিল্লির বিমানবন্দরে নামার পরপরই বিমানের ভেতর থেকে সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রানকা এবং সৌরভ দাসকে আটক করা হয়। আটক অবস্থায় মহারাষ্ট্রে নিজ বাড়িতে অভিজিৎ দীপকের ঠাকুরমা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শোকাহত দীপকেকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে গুরুগ্রামের বাসভবন থেকে আটক জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীসহ সিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে গভীর রাতেও পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছিল।

যন্তর মন্তরে প্রবেশের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা ও ব্যারিকেড থাকায় আন্দোলন মুহূর্তের মধ্যেই পুরো দিল্লিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভে অংশ নিতে দিল্লি হাটের কাছে জড়ো হওয়া আইসা নেত্রী নেহা বোরা ও অন্যান্য আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।

CJP Leader Arrest
পুলিশ পরবর্তীতে জানায়, প্রবীণ নাগরিক ও নারীদের প্রথমে মুক্তি দেয়ার পর রাতের মধ্যে প্রায় ৩,০০০ আটকদের সকলকেই পর্যায়ক্রমে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

দিল্লির উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে চেন্নাই থেকে ক্ষোভ ও হুংকার প্রকাশ করেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, আমাদের সব নেতাকে আটক করুন। দেশের সব তরুণদের গ্রেপ্তার করুন। আমাদের সবাইকে জেলে ভরুন! আমরা আপনাদের চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছি এবং একচুলও পিছপা হব না। আমার কথা টুকে রাখুন, প্রয়োজনীয় সব তথ্য আমাদের হাতে চলে এসেছে। নরেন্দ্র মোদির ১৫ বছরের রাজনৈতিক নাটক এবার শেষ হতে চলেছে।

Delhi Protest 02
এদিকে আটক হওয়ার আগে আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল সারা দেশের তরুণ সমাজকে ‘দিল্লি চলো’ আহ্বান জানিয়ে বলেন, মোদিজি এতদিন ভোট চুরি করে নির্বাচন জিততেন, এবার হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। যেখানেই পুলিশ আপনাদের আটকাবে, সেখানেই বসে পড়ুন। সেই জায়গাটিকেই যন্তর মন্তরে পরিণত করুন, পুরো দেশকে আজ যন্তর মন্তর বানিয়ে দিন!

কেজরিওয়ালকে আটক করার সময় পুলিশ সদস্য ও দলীয় কর্মীদের মাঝে তুমুল ধস্তাধস্তি হয় এবং পরে পুলিশ তাঁকে পা ও বুক ধরে চ্যাংদোলা করে বাসে তোলে। পরে মুক্ত হয়ে কেজরিওয়াল হুঁশিয়ারি দেন, মোদিজিকে বলতে চাই, আমাদের বন্দি করার জন্য আপনার জেলখানায় জায়গা কম পড়ে যাবে!

দক্ষিণ অ্যাভিনিউতে মুখে কালো কসটেপ এঁটে মৌন প্রতিবাদ জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুলিশি বাস থেকে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, এটি ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে, দেশে এখন চরম ‘সুপার ইমার্জেন্সি’ চলছে।

Delhi Protest 13
অন্যদিকে সমাজকর্মী ও উদ্ভাবক সোনাম ওয়াংচুক মোদি সরকারের এই ভূমিকাকে ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, রোববারের মধ্যে আটকদের মুক্তি দেওয়া না হলে তিনি 'অনশন' কিংবা 'পদযাত্রা' শুরু করবেন।

অন্যদিক থেকে এই নজিরবিহীন বিক্ষোভের তীব্র সমালোচনা ও সরকারের কড়াকড়িকে সমর্থন জানিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। এক সংবাদ সম্মেলনে বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী রভি শঙ্কর প্রসাদ বলেন, ভারত কোনো ‘বানানা রিপাবলিক’ বা দুর্বল রাষ্ট্র নয়। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এ দেশ কারো কাছে মাথা নত করেনি এবং করবেও না। অননুমোদিত প্রতিবাদের মাধ্যমে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা ব্যর্থ করা হয়েছে। ভারত রাজপথের হট্টগোলে নয়, বরং সংসদীয় নিয়ম-কানুন দিয়ে পরিচালিত হবে।"

দিল্লির এই আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে মুম্বাই, চেন্নাই এবং আহমেদাবাদেও। মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে সিজেপির সমর্থনে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সময় পুলিশ মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী এবং জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা ইমরান খানসহ প্রায় ২০০ জনকে আটক করে।

Delhi Protest 11
উল্লেখ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় প্যারা-মিলিটারির ২৫ হাজারেরও বেশি সদস্য পুরো শহরে টহল দিচ্ছে। টানা ২৪ ঘণ্টা দিল্লির ৪৫টি প্রধান মেট্রো স্টেশনের গেট বন্ধ রাখা হয়েছিল, বাতিল করা হয়েছিল ২৫০টিরও বেশি দূরপাল্লার ট্রেন এবং যন্তর মন্তরের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল।