ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দীর্ঘ ১২ বছরের শাসনকালে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও গণ-আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছেন এক প্রায় অপরিচিত ২৯ বছরের পিএইচডি গবেষক। নাম তাঁর নেহা বোরা। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজিপি) এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলনে যে কয়েকজন শীর্ষ আন্দোলনকারীকে সম্প্রতি পুলিশ আটক করেছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম তিনি।
বামপন্থী ছাত্র সংগঠন নিখিল ভারত শিক্ষার্থী সমিতির সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা কিন্তু রাতারাতি বা পরিকল্পিতভাবে রাজনীতিতে আসেননি। উত্তরাখণ্ডের হিমালয় ঘেঁষা অঞ্চলে বেড়ে ওঠা নেহার বাবা ছিলেন সেনা কর্মকর্তা, যার ফলে ছোটবেলা থেকেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বড় হতে হয়েছে তাঁকে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর, তিনি বর্তমানে ঐতিহাসিক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের 'স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড নান্দনিকতা' বিভাগে পিএইচডি করছেন। রাজনীতির ময়দানে নামার আগে থিয়েটার বা নাটকই ছিল তাঁর মূল ক্ষেত্র। থিয়েটারের মঞ্চেই তিনি শিখেছিলেন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আর অনুভূতিকে গভীরভাবে বুঝতে।
পরবর্তীতে ২০১৯ ও ২০২০ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন বিরোধী আন্দোলন তাঁর জীবনে বড় রূপান্তর আনে। বই আর সিনেমার পাতায় দেখা রাজনৈতিক তত্ত্বগুলোকে সহপাঠীদের রাজপথে নামিয়ে বাস্তব আন্দোলনে পরিণত হতে দেখে নিজেও সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন নেহা।
সম্প্রতি 'ককরোচ জনতা পার্টি' ও ছাত্র সংগঠনগুলোর ডাকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের মূল দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের নামে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম গায়েব করে দেয়া হয়েছে, যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি! এই বিশাল জালিয়াতির বিরুদ্ধে সরব হতেই শনিবার সেন্ট্রাল দিল্লির জন্তর মন্তর অবরুদ্ধ করে পুলিশ। তবে দমে যাননি নেহা। তিনি তৎক্ষণাৎ এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে লেখেন, আজ দিল্লি হাট-ই হবে নতুন যন্তর মন্তর। মিছিল নিয়ে সেখানে পৌঁছানো মাত্রই পুলিশ তাকেসহ একাধিক কর্মীকে আটক করে।
তবে পুলিশি প্রিজন ভ্যানে বন্দি থেকেও তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল টলমল। সেখান থেকেই এক ভিডিও বার্তায় তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, আমাকে আটক করা হয়েছে, কিন্তু আন্দোলনকে আটক করা সম্ভব নয়। আপনারা যেখানে আছেন, সেখান থেকেই প্রতিবাদ চালিয়ে যান। পরে শনিবারই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগেও জুলাই মাসে সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে জন্তর মন্তরে তাঁর দেওয়া ঝাঁঝালো বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছিল।
কোমল কণ্ঠের কিন্তু মাইক হাতে অত্যন্ত ক্ষুরধার নেহা হিন্দি ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার, বেকারত্ব এবং সরকারি জবাবদিহিতার কথা বলে যুবসমাজের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন। বারবার গ্রেপ্তার ও আটক হওয়ার পরেও, ছাড়া পেয়েই প্রতিবার রাজপথে ফিরে এসেছেন তিনি।
নেহা বোরার কথায়, ভয় যেমন ছোঁয়াচে, আশাও ঠিক তেমনি ছোঁয়াচে! মানুষের মনে এখন সাহস এসেছে কারণ তারা বিশ্বাস করে যে তারা প্রতিবাদ করতে পারে। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, প্রতারণা আর হতাশা থেকেই আজ রাজপথে মানুষের এই ঢল নেমেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স