বৃষ্টির সঙ্গে ভিড় আর সংকীর্ণ গেটের কারণেই বিপর্যয়

সাপ্তাহিক ছুটির দিন, মুষলধারে বৃষ্টি, মণ্ডপের সংকীর্ণ প্রবেশ ও প্রস্থান পথ এবং অপর্যাপ্ত আলোর বন্দোবস্ত, সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল কলকাতার উত্তর অংশের দুর্গোৎসব। শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘চোরবাগান সর্বজনীন’ (সারদা পার্ক) পূজামণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড়ের মাঝে পদদলিত হয়ে ১৭ জন পূজারি ও দর্শনার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় এমনই কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরেছেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ কর্মকর্তারা।

প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই মণ্ডপটি উত্তর কলকাতার চোরবাগান অঞ্চলের মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট ও রাম মন্দিরের নিকটবর্তী হাতিবাগান ও বিডন স্ট্রিট এলাকার অন্যতম পরিচিত একটি জনবহুল পূজা। শনিবার সন্ধ্যায় সেখানে নেমে এসেছিল ঘোর অমানিশা।

Kolkata Stampade4
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মণ্ডপটির প্রবেশ ও প্রস্থান গেট অত্যন্ত ছোট ও সংকীর্ণ ছিল এবং ওই চত্বরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও ছিল না। এর মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে বাইরে অপেক্ষমাণ বিশাল জনস্রোত একযোগে ভেতরে ঢোকার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে। ঠিক তখনই মণ্ডপের একটি অংশ আংশিক ভেঙে পড়লে সংকীর্ণ গলি ও রাস্তায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে এক স্থানীয় বাসিন্দা, যাঁর মেয়ে ও নাতনি গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আইএএনএসকে জানান, প্রবেশপথ ও প্রস্থান গেট দুটোই ভীষণ সরু ছিল এবং এলাকায় কোনো আলোর ব্যবস্থাও ছিল না। হুট করে সবাই হুড়োহুড়ি করে পড়তে শুরু করে। আমি কোনোভাবে নিজেকে সামলে দাঁড়াই, ভয়ে শিউরে উঠেছিলাম। শিশু ও ছোট ছেলেমেয়েদের ওপর বহু মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। কিন্তু সে সময় আশেপাশে কোনো পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবক কাউকেই দেখতে পাওয়া যায়নি।

অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী এএনআইকে জানান, এই হুড়োহুড়ি ও পদদলনের চাপে বহু মানুষ জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। অনেক স্বজন আহতদের বাঁচানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষা না করে দ্রুত মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে ছোটেন।

Kolkata Stampade2
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও বিবরণেও প্রায় একই চিত্রের কথা উঠে এসেছে। গিরিশ পার্ক থানার আওতাধীন চোরবাগান পূজামণ্ডপের এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সন্ধ্যা প্রায় ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে হুট করে বৃষ্টি শুরু হলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ভিড় একযোগে সামনের দিকে এগোতে থাকে। ঠিক তখনই কয়েকজন মাটিতে পড়ে যান এবং মুহূর্তের মধ্যে তা ভয়ংকর পদদলনে রূপ নেয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সব আহতকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং মুখ্য সচিব মনোজ আগরওয়াল দ্রুত হাসপাতালে ছুটে গিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়া রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে গভীর শোক প্রকাশ করে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন এবং শোকার্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

আনন্দ-উল্লাসের দিনে সামান্য অবহেলা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি যে কতটা বড় ট্র্যাজেডি ডেকে আনতে পারে, কলকাতার চোরবাগানের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা তারই এক নির্মম দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো।