শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ মুহূর্তে রূপ নিয়েছে গভীর শোকে। শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের কলকাতার উত্তর অংশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পূজামণ্ডপে বৃষ্টির মাঝে অতিরিক্ত ভিড়, সংকীর্ণ যাতায়াত পথ, অন্ধাকার এবং একটি বিশেষ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে ১৩ জন নারী ও একটি শিশুসহ ১৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৫ জন।
শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে গিরীশ পার্ক থানা এলাকার বিখ্যাত ‘চোরবাগান সর্বজনীন’ (সারদা পার্ক) পূজামণ্ডপের প্রস্থান গেটে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। কলকাতা পুলিশের দেওয়া এক বিবরণে জানানো হয়, বৃষ্টির সময় দর্শনার্থীদের প্রচণ্ড ভিড়ের চাপে এই পদদলনের ঘটনা ঘটে।

খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ কন্ট্রোল রুম, দমকল বাহিনী, কলকাতা পুলিশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল এবং জরুরি চিকিৎসাসংবলিত অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ জন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (এমসিএইচ) নেওয়া হয়েছে এবং দুর্ঘটনাজনিত কারণে পূজামণ্ডপটি দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মণ্ডপটির প্রবেশ ও প্রস্থান গেট অত্যন্ত সরু ও সংকীর্ণ ছিল এবং ওই এলাকায় কোনো আলোর ব্যবস্থাও ছিল না। বৃষ্টির কারণে বাইরে অপেক্ষমাণ দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মধ্যে হুট করে তাড়া তৈরি হয়। অন্ধকার ও সংকীর্ণতার মাঝে কয়েকজন পড়ে যাওয়ার পর তাদের ওপর দিয়ে জনস্রোত পার হতে শুরু করে। সে সময় ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবক উপস্থিত ছিল না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে, ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, পূজামণ্ডপ কর্তৃপক্ষের একটি মাইকের ঘোষণা দর্শনার্থীদের মধ্যে হঠাৎ অতিরিক্ত তাড়া ও হুড়োহুড়ি তৈরি করেছিল, যা এই বেদনাদায়ক পরিস্থিতি ডেকে এনেছে।

আবার, চোরবাগানের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেছেন, মণ্ডপে আগুন লেগেছে, এই ভুল তথ্য দর্শকদের মণ্ডপের মধ্যে উদ্যোক্তারা দিয়েছিলেন। ফলে হুড়োহুড়ি লেগে গিয়েছিল। তাতেই বিপর্যয় ঘটে গেল। মানুষের প্রাণহানি হল। আরেক প্রত্যদর্শীর কথায়, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর পুজো কমিটির কাউকে দেখা যায়নি। স্থানীয়রাই আহতদের উদ্ধার করেছে। কোনওক্রমে মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চোখে না দেখলে এই বীভৎস ঘটনা আন্দাজ করা যাবে না।

কলকাতার এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত বেদনাদায়ক’ উল্লেখ করে তিনি নিহতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ব্যবস্থার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে, রাজ্য সফরে থাকা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দুঃখপ্রকাশ করে রবিবারের তাঁর সমস্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থগিত করেছেন এবং হাসপাতালে গিয়ে আহতদের দেখতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বর্তমানে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।
