দেশব্যাপী উগ্র সাম্প্রদায়িকতার ঘটনায় ১৮ নাগরিকের উদ্বেগ

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বেশ কিছু সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন ১৮ বিশিষ্ট নাগরিক। 

বুধবার (৬ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই শঙ্কার কথা জানান তারা।

বিবৃতিতে বলা হয়, বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার ও জামিন না দেওয়া, কলেজশিক্ষক লতা সমাদ্দারকে টিপ পরার কারণে পুলিশ সদস্যের লাঞ্ছনা, মুজিব শতবর্ষে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙা সমর্থন করে ভাস্কর্য ইসলামবিরোধী কাজ বলে চিহ্নিত করে পুলিশ সদস্যের ফেসবুক ও সরাসরি মাইকে ঘৃণ্য বক্তব্য, ইতোপূর্বে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষকে ঘৃণা করার শিক্ষা সম্বলিত রচনার অন্তর্ভুক্তি, দু’বছর আগে একজন সচিবের টাকনুর উপরে কাপড় পরার বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি এবং বাংলা নববর্ষের প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান বিদআত বলে ঘোষণা আমাদের মনে এই ছায়াপাত করে যে, রাষ্ট্রকাঠামোর অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তি তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। 

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত কয়েক বছর যাবৎ সমাজে বিচ্ছিন্নভাবে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী সহিংস ঘটনা ঘটিয়েছে। যা সামাজিকভাবে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কতিপয় সদস্য যখন সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে শিক্ষক, শিল্পী ও সাধারণ মানুষকে নানাভাবে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত করছে তখন জনগণের মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যে, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের মূল চার নীতি এবং মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করতে সচেষ্ট নয়। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিকে বিধর্মীদের সংস্কৃতি বলে মিথ্যাচার করে সরকারের ও রাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থান নেওয়া স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদরের উত্তরসূরিরা আজ রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিপর্যন্ত করে ফেলার প্রয়াস নিয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দায়িত্বে থাকাকালে প্রতিক্রিয়াশীলদের এ ধরনের ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, আমাদের নির্লিপ্ততায় ধর্মান্ধদের রাষ্ট্রক্ষমতার অভ্যন্তরে শিকড় বিস্তার। এখনই সময় এ প্রবণতা রোধ এবং এর শিকড় উৎপাটনের। আর এই দায়িত্ব মূলত সরকারের। এক্ষেত্রে দ্বিধা ও বিলম্ব মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উদ্ভব এবং সেই ধারার অনুগত শিক্ষা ও সংস্কৃতির উত্থান ঘটে। যা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে একটি পশ্চাৎপদ রাষ্ট্রে পরিণত করে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এক যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থেকেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে সেই রাহুমুক্ত করতে পারেনি। এখনই সময় এই প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সর্বশক্তি সংহত করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সব স্তর থেকে তাদের বিতাড়িত করা। আর এ মহতি কাজে বাংলাদেশের জনগণ সরকারের সঙ্গে থাকবে।

এই বিশিষ্টজনেরা বলেন,  কোমলমতি শিশু-কিশোরদের অবৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও সাম্প্রদায়িক পাঠদানই আজকের এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। কেননা আজকের দানবরূপী এই মানুষগুলো একসময় শিশু-কিশোর ছিল। আমরা বাংলাদেশের শিক্ষাধারায় বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমতার সমাজ গড়ার লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে ঘৃণা সঞ্চার করে এমন রচনা পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করছি। আমরা হৃদয় মণ্ডলের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি। আর যে কিশোর ছাত্ররা মৌলবাদী চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞানশিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে অপমান করে পুলিশে সোপর্দ করেছে তাদের মধ্যে মানবিক চেতনার বিকাশ ঘটানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনের যেসব ব্যক্তি এ ধরনের কাজে সহযোগিতা ও ইন্ধন জোগাচ্ছেন তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।

সাধারণ মানুষের প্রতি আহবান জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা বাংলাদেশের সব মানুষকে আহ্বান জানাই, আসুন আমরা যে-যার অবস্থান থেকে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, সম্প্রীতি ও ন্যায়ের সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একযোগে কাজে নেমে পড়ি। বিলম্ব হয়েছে বিস্তর। এখন সময় হয়েছে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের প্রতিহত করার ও দেশ থেকে বিতাড়িত করার।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন– আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, সৈয়দ হাসান ইমাম, অনুপম সেন, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, সারোওয়ার আলী, আবেদ খান, সেলিনা হোসেন, লায়লা হাসান, আবদুস সেলিম, মফিদুল হক, শফি আহমেদ,  শাহরিয়ার কবির, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, মুনতাসীর মামুন, সারা যাকের, শিমূল ইউসুফ এবং হারুণ হাবীব।


একাত্তর/এআর