স্বল্পোন্নত দেশগুলো করুণা বা দাক্ষিণ্য চায় না: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলো করুণা বা দাক্ষিণ্য চায় না বরং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের ন্যায্য পাওনা চায়।

সোমবার (১৩ মার্চ) বিকেলে, গণভবনে সদ্য সমাপ্ত কাতার সফর নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, সফরে করোনা মহামারি ও চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী খাদ্য, জ্বালানি ও আর্থিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য নেয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, এ ক্ষেত্রে আমি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আর্থিক সহায়তা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, নিরাপদ অভিবাসন, জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বিশেষ প্রয়োজনের কথা তুলে ধরি।

এছাড়া বাংলাদেশসহ উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর উন্নয়ন অর্জনকে গতিশীল রাখতে বর্ধিত সময়ের জন্য এলডিসিদের জন্য প্রযোজ্য অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

কাতারের দোহায় স্বল্পোন্নত দেশসমূহ সংক্রান্ত পঞ্চম জাতিসংঘ সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের অভাবনীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত ৪ মার্চ কাতার সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। সফর শেষে ৮ মার্চ দোহা থেকে দেশে ফেরেন তিনি। এলডিসি সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে এটাই সম্ভবত বাংলাদেশের শেষ অংশগ্রহণ। কারণ, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী ৫ মার্চ কাতার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এলডিসি সম্মেলনের ওপেনিং প্লিনারি মিটিংয়ে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। এই অনুষ্ঠানে তিনি ছাড়াও কাতারের আমির, জাতিসংঘের মহাসচিব, ৭৭তম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং এলডিসি গ্রুপের বর্তমান চেয়ার মালাউই -এর রাষ্ট্রপতি বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব তাঁর বক্তব্যে বলেন, এলডিসি গ্রাজুয়েশন হলো পুরস্কার স্বরূপ, এটি কোনো শাস্তি নয়।

৬ মার্চ সকালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘দ্য রাইজ অব বেঙ্গল টাইগার: পটেনশিয়ালস অব ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিজনেস সামিটে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এই অনুষ্ঠানে কাভারের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য অংশগ্রহণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশ ও কাতারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানাই। দু’দেশের সরকারের মধ্যে একটি যৌথ ব্যবসা ও বিনিয়োগ কমিটি এবং দু’দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের সমন্বয়ে একটি যৌথ বিজনেস ফোরাম গঠনেরও প্রস্তাব করি। এছাড়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি সঞ্চালন ব্যবস্থা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, স্টার্ট আপসহ বিভিন্ন খাতে কাতারের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাই।

সরকারপ্রধান জানান, একইদিন দুপুরে তিনি বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল আয়োজিত এক সাইড ইভেন্ট ইনভেস্টমেন্ট ইন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন এলডিসিস ফর স্মার্ট অ্যান্ড ইনোভেশন সোসাইলিটিস- এ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

এই ইভেন্টে মিশর, সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়ার মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি, জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা, ওএসিডি, আইটিইউ, ডব্লিউআইপিও এবং বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা—ফাও এর বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ সময় তাঁরা আমাদের সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নে অর্জিত সফলতার প্রশংসা করেন এবং আমাদের রূপকল্প ২০৪১ অনুযায়ী ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৬ সালে তার সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কৃষি গবেষণা উৎসাহিত করা, ২০০৯ সাল থেকে দেশব্যাপী মজবুত ও নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, জৈব প্রযুক্তি ইত্যাদি খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা, বৃত্তি, অনুদান প্রচলনসহ নানাবিধ উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন বলে জানান।

একই দিন সন্ধ্যায় উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বা জিসিসিভুক্ত দেশসমূহ, ইরাক, জর্ডান, লেবানন ও তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে আয়োজিত আঞ্চলিক দৃপ্ত সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্মেলনে আমি জাতির পিতার অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের নতুনতর দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিই।

তিনি আরও বলেন, এসব দেশের সঙ্গে রপ্তানি প্রসার, বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসীদের স্বার্থ ও অধিকার সুরক্ষা, প্রযুক্তি সহযোগিতাসহ অর্থনৈতিক কূটনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য আমাদের রাষ্ট্রদূতদের নির্দেশনা প্রদান করি। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কনস্যুলার সেবার পরিসর বৃদ্ধি করার পরামর্শ নিই।

৭ মার্চ সকালে এলডিসি সম্মেলনের ‘Enhancing the Participation of Least Developed Countries (LDCs) in International Trade & Regional Integration’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে বুকড়ির রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কো-চেয়ারের দায়িত্ব পালন করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন বলে জানান।

জাতিসংঘ সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। ৫ই মার্চ কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ বিন খলিফা আল থানির সঙ্গে তার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে কাতার বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে দেশটির আমির আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: রাদওয়ান ববির প্রসঙ্গে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

শেখ হাসিনা জানান, ৬ মার্চ কাতার ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন আমিরের মাতা শেখা মোজা বিনতে নাসেরের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। বৈঠকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। শেখা মোজা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এডুকেশন অ্যাবোভ অল ফাউন্ডেশন এর আওতায় বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে ঝড়ে পরা শিক্ষার্থীদের সহায়তার লক্ষ্যে ফাউন্ডেশনের সঙ্গে ১২.৭ মিলিয়ন ডলার অনুদান সম্পর্কিত একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের পক্ষে এই স্মারকটি সই করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামগ্রিকভাবে, জাতিসংঘ সম্মেলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে বলে আমি মনে করি। এ সম্মেলনে আমরা রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের পথে এলডিসি থেকে উত্তরণ ও এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের গৃহীত বিভিন্ন প্রস্তুতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করেছি। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকেও আমরা দোহা প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন এ আমাদের জন্য প্রযোজ্য বিষয়গুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে অঙ্গীকার করেছি।

আমরা আশা করব, এই প্রোগ্রাম অব অ্যাকশনে জাতিসংঘের আওতায় সাসটেইনেবল গ্রাজুয়েশন সাপোর্ট ফ্যাসিলিটি স্থাপনের ব্যাপারে যে উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে তা যথাযথভাবে এগিয়ে যাবে।


একাত্তর/আরএ