অর্থনীতির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিএনপির কোনো বক্তব্য নেই, তাদের সব কথা নির্বাচনকেন্দ্রিক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভালো নির্বাচন হয় এ অজুহাতে আজীবন অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক সরকার থাকতে পারে না।
শনিবার দেশের গণমাধ্যম সম্পাদকদের শীর্ষ সংগঠন এডিটরস গিল্ড আয়োজিত ‘নির্বাচনের বন্ধুর পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের নির্ভরতা অন্য দেশে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধীনে নির্বাচন ভালো হওয়ার অজুহাতে আজীবন অগণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা রাখারও সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বৈঠকের বক্তারা।
টিবিএন ২৪ এর প্রধান সম্পাদক নাজমুল আশরাফ বৈঠকে বলেন, বিএনপি মনে করে এই সরকারে অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। তার প্রমাণ হচ্ছে, ১৪ ও ১৮তে সুষ্ঠু হয়নি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় সেজন্য আজীবন সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে, আমি এই অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক ব্যবস্থার পক্ষে না।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বিএনপি নির্বাচনে এভাবে অংশগ্রহণ না করতে করতে তারা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে- এই কথটা আদৌ উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কারণ, ক্রমান্বয়ে তাদের সমর্থকরা হয়তো অন্য বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে ঢুকে পড়তে পারে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) ড. হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, আওয়ামী লীগ যে বর্জনের রাজনীতি করে অর্জন করেছে, আজকের বিএনপি কিন্তু সেই বর্জনের রাজনীতি দিয়ে অর্জন করতে পারেনি। এই বর্জন করা তাদের জন্য ঠিক হয়েছে কিনা?
সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবিতে হরতাল-অবরোধ অব্যঅহত রেখেছে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের সমমনা দলগুলো। তাদের দাবি, ‘একতরফা’ নির্বাচন বন্ধ করতে হবে। নির্বাচনী তৎপরতায় যুক্ত হওয়ায় কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারও করেছে দলটি।
গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ পণ্ড হবার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো।
একই দাবিতে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিলো বিএনপি। ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে সেই নির্বাচনে জিতে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি গণফোরামের ড. কামাল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে ভোটে অংশ নেয়। ভোটে ভরাডুবি ঘটে বিএনপির। এরপর কারচুপির অভিযোগ তোলে তারা। সংসদের মেয়াদের শেষ দিকে এসে বিএনপির সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করেন।
এবারও ২০১৪ সালের মত একই দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি। ফিরে এসেছে সংঘাতের পরিবেশ। যানবাহনে অগ্নিংযোগ আর নাশকতার ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে রোজই অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এডিটরস গিল্ডের গোল টেবিল বৈঠকে ডিবিসি নিউজের প্রধান সম্পাদক ও সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের অগ্রগতির পথকে রুখবার জন্য তারা চেষ্টা করেন তারাই কিন্তু পথটাকে কিছুটা কণ্টকাকীর্ণ করে রেখেছেন- এই বিষয়টা যদি রাজনীতিবিদরা বোঝেন তাহলে সেই পথকে মসৃন করা সম্ভব।
বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনসহ মানবাধিকার অধিকার নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো সোচ্চার। অথচ তারাই আবার ফিলিস্তিনের গাজায় নারী ও শিশুদের গণহত্যা সমর্থন করে ইসরাইলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে বলে জানান মানবাধিকার কর্মী খুশি কবীর।
তিনি বলেন, যে দেশগুলো আমাদের মানবাধিকারের কথা বলছে তাদের কোনো অধিকার নেই। গাজা এবং পশ্চিমতীরে তারা যা করছে, ইসরাইলকে যেভাবে সমর্থন করছে সরাসরি অস্ত্র দিয়ে মানুষকে হত্যা করার জন্য। সেখানে জোনোসাইড হচ্ছে। তারা কোন সাহসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলে?
সুষ্ঠু নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে পোশাক রপ্তানিতে পশ্চিমা দেশগুলোর বিধি নিষেধ দেয়ার গুঞ্জনের নানা দিকও উঠে আসে গোল টেবিলে।
তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ইথিওপিয়ায় যে শুধু কারখানার মালিকরা গেছে তা না। এখানে কিন্তু বিশ্বব্যাংক, বিভিন্ন ব্রান্ড যুক্ত ছিলো। তারা বাংলাদেশ বা চীনের বিকল্প একটা জায়গহা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলো। কিন্তু একদম ফ্লপ করে। প্রচুর লস করে তারা ফেরত আসে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআই’ নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, তারা (বিএনপি) একটা আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এখানে তাদের ইকোনমিক এজেন্ডা কী? আমি জানি না। তাদের সামাজিক এজেন্ডা কী তাও জানি না।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসছে না কেন? সেটা কী পরিবেশের জন্য নাকি তারেক জিয়ার নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হবে সেজন্য।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশনের এবং আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে বলে আশা এডিটরস গিল্ডের।
গোলটেবিলের সঞ্চালক এডিটরস গিল্ডের সভাপতি একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু বলেন, নির্বাচনে মানুষ অংশগ্রহণ করুক। অন্যদিকে সন্ত্রাস বা বোমাবাজির মাধ্যমে মানুষকে প্রতিহত করার চেষ্টা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিহত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে বলেই আমাদের বিশ্বাস।