সংবাদ ভাষ্য

বিতর্কিত কংগ্রেসওমেনের চিঠির গুরুত্ব কতটুকু?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ইস্যুতে এবং ন্যূনতম মজুরির দাবি মেনে নিতে সরকার ও তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদকদের চাপ দিতে আমেরিকান অ্যাপারেলস অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনকে (এএএফএ) চিঠি দিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের আট সদস্য। 

চিঠিতে সই করেছেন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর, জেমস পি ম্যাকগভার্ন, জ্যান শাকোস্কি, রাউল এম গ্রিহালভা, বারবারা লি, ডেভিড জে ট্রোন, আলেক্সান্ড্রিয়া ওকাসিও-করটেজ ও সুজান ওয়াইল্ড। 

আট সদস্যের সই চিঠিতে থাকলেও সেটি প্রকাশ করেছেন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর, যিনি কট্টর উগ্রপন্থী হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত। যার কারণে শক্তিশালী মার্কিন পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। এছাড়া তিনি পাকিস্তান সরকারের অর্থায়নে সেদেশের সরকার অধ্যুষিত কাশ্মীর ভ্রমণ করেছিলেন। যেটি নিয়ে পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।   

কংগ্রেস সদস্যদের লেখা চিঠিতে বলা হয়, সম্প্রতি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের যে মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে, তা দিয়ে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। এতে শ্রমিকদের প্রতিবাদ আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। আন্দোলন দমন করতে পুলিশ সহিংস পথ বেছে নিয়েছে। এতে অন্তত চারজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি অসংখ্য শ্রমিক আহত হয়েছেন; শ্রমিকনেতাদের অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে আটক করা হয়েছে; এমনকি অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবির প্রতি সমর্থন জানালেও কংগ্রেস সদস্যরা মনে করেন, শুধু কথায় কাজ হবে না, সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে হবে। 

যদিও চিঠির দাবিগুলো সম্পূর্ণ ভুল। ন্যুনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় আগের। যদিও সারাদেশে নয় কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় হয়েছে শ্রমিকদের আন্দোলন। গত ৮ নভেম্বর পোশাক শ্রমিকদের নুন্যতম মজুরি ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। এরপর আন্দোলন একেবারে থেমে যায়। শ্রমিকরা আনন্দে কাজে ফিরেন।

এরপর আর বাংলাদেশে শ্রমিক অসন্তোষের কোন ঘটনা কোথাও ঘটেনি। শ্রমিক অসন্তোষের সময় ব্যাপক ভাংচুর চালানো হয়েছিল। তখন ভাংচুরের মধ্য থেকে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয় পুলিশ। এরপর আর কোন শ্রমিককে কোন প্রকার হয়রানি করা হয়নি। গ্রেফতারদের মধ্যে কাকে ছাড়া হবে, বা কাকে ছাড়া হবে না, এটা পুলিশি তদন্তের বিষয়। 

চিঠিতে কংগ্রেস সদস্যরা উল্লেখ করেন, এএএফএ যেন শ্রমিক ও ইউনিয়ন নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা তুলে নিতে নির্দেশনা দেয়। তারা যেন সরবরাহকারীদের এ বিষয়ে সতর্ক করে দেয় যে শ্রমিক ও ইউনিয়ন নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের ও তাদের হয়রানি করা গ্রহণযোগ্য নয় এবং সেক্ষেত্রে পোশাক কেনার সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে। কারখানার মালিকদের ব্যক্তিগতভাবে ও শিল্পসংগঠনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে এটা নিশ্চিত করে যে, সম্প্রতি বন্ধ হওয়া কারখানার শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করা হবে। 

অথচ শ্রমিক অসন্তোষ চলাকালীন বন্ধ থাকা কারখানার প্রত্যেক শ্রমিককে তাদের বেতন দেওয়া হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের শ্রম নীতিতে কাজ না থাকলে বেতন দেওয়ার নির্দেশনা নেই। 

এ ছাড়া কংগ্রেস সদস্যদের চিঠিতে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া যেন বাইরের কারখানাগুলোর মতো ‘অন্যায্য’ না হয়, তা নিশ্চিত করতে এএএফএকে চাপ দেওয়ার আহবান জানানো হয়েছে। 

এছাড়া চিঠিতে শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকারসহ শ্রম ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সদস্য কোম্পানিগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য প্রতিটি কারখানার অডিট করা হয়। এসব অডিট করেন মার্কিন ক্রেতার মনোনীত প্রতিষ্ঠান। সুতরাং চিঠিতে উল্লেখিত অনেক বিষয়ের ভিত্তি নেই। 

পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর সফরের আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনার সাথে দেখা করেন ইলহান ওমর। ইমেজ: সংগৃহীত

চিঠির নেপথ্যে কে?

মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর কট্টর উগ্রপন্থী হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীর সফরের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল পাকিস্তান সরকার। ডেমোক্রেটিক পার্টির একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত বিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ওমর গত বছরের এপ্রিলে পাকিস্তান সফর করেছিলেন। ওই তথ্যে দেখা যায়, পাকিস্তান সরকার ১৮ থেকে ২৪ এপ্রিলের এই সফরের জন্য অর্থায়ন করেছিল, যার মধ্যে ছিল থাকার এবং খাবার খরচ।

সফরকালে ওমর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিনা রাব্বানী খারের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। কাশ্মীর সংঘাত এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুর মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে আলোচনা হয়েছিল। ওমর ইমরান খানের সাথেও দেখা করেন এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর সফর করেন, যা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্বারা সমালোচিত হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী ওমরের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করে বলেন, আমাদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা আমাদের কাজ। এই সফর নিন্দনীয়।

ওমরের বিদেশ সফর নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। একই বছরের নভেম্বরে তিনি কাতার সফর করেন এবং কাতার সরকার তার সফরের জন্য অর্থায়ন করে। কংগ্রেসওম্যানের বিতর্কিত বক্তব্যের ইতিহাস নজর এড়িয়ে যায়নি। বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি থেকে তাকে অপসারণ করা হয়েছিল। 

ওমর ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থী সদস্য এবং ‘স্কোয়াড’ নামক মৌলবাদী গোষ্ঠীর চারজনের মধ্যে একজন। কংগ্রেসের তিনজন মুসলমানের মধ্যে তিনি একজন, তিনি মিনেসোটার একটি নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে তার মতো সোমালিয়া থেকে আসা প্রচুর সংখ্যক অভিবাসী রয়েছে।

গত বছর মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরকে 'হিন্দু-ফোবিক' প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের প্রতি আহবান জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি হিন্দু সংগঠন।

ইলহান ওমর ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থী সদস্য এবং ‘স্কোয়াড’ নামে মৌলবাদী গোষ্ঠীর চারজনের মধ্যে একজন। ইমেজ: সংগৃহীত

আইনপ্রণেতা রাশিদা তালিব এবং হুয়ান ভার্গাসের যৌথ পৃষ্ঠপোষকতায় প্রস্তাবে মার্কিন আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের (ইউএসসিআইআরএফ) সুপারিশ অনুযায়ী কাজ করতে এবং আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের অধীনে ভারতকে বিশেষ উদ্বেগের দেশ (সিপিসি) হিসাবে মনোনীত করার জন্য স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতি আহকান জানানো হয়েছে।

হিন্দু প্যাক্টের নির্বাহী পরিচালক উৎসব চক্রবর্তী ইন্ডিয়া টুডেকে বলেন, হাউস রেজুলেশন ১১৯৬-এর মাধ্যমে কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর স্পষ্টতই জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলোর কথা বলছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেওয়া একজন নির্বাচিত কর্মকর্তার কাছ থেকে দেখা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

তিনি বলেন, এই প্রথমবার নয়, শেষবারও তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা প্রকাশ করে হিন্দু ও ভারতবিরোধী পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন। 

চিঠি নিয়ে উদ্বেগের কিছু দেখতে না সরকার

তবে কংগ্রেস সদস্যের চিঠি নিয়ে অতীতে কখনই উদ্বেগ প্রকাশ করেনি সরকার। এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জানিয়েছিলেন, কংগ্রেস সদস্যদের এ রকম চিঠি অতীতেও এসেছে, ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে আসতে পারে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে এই ধরনের কার্যক্রম তত বাড়তে থাকবে। 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশে কারো কাছে ধর্না দিয়ে বা কারো চাপে পড়ে বা কারো সঙ্গে সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতেই হবে- এরকম কোনও নীতির প্রতি অগ্রসর হয়ে বাংলাদেশের মানুষকে পেছনে ফেলে দেওয়ার নীতিতে আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে না। 

কূটনীতিকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোয় লবিং নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রে লবিং খুব সাধারণ একটা বিষয়। সেখানে লবিংয়ের মাধ্যমেই অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আবার লবিংয়ের মাধ্যমে চিঠিও লেখা হয়।