হলফনামায় প্রার্থীরা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে দাবি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির। সংস্থাটির অভিযোগ প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য যাচাই করছে না রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা। প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব জানিয়েছে টিআইবি।
সংস্থাটি বলছে, এবার সর্বোচ্চ সংখ্যক ব্যবসায়ী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এদের মধ্যে ১৮ জনের সম্পদ শতকোটি টাকার বেশি।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘নির্বাচনী হলফনামার তথ্যচিত্র: জনগণকে কী বার্তা দিচ্ছে?’ শীর্ষক এই বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।
প্রার্থীদের হলফনামা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করেছে টিআইবি।
এবারের নির্বাচনে এক হাজার ৮৯৬ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। তাদের হলফনামায় দেখানো সম্পদের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে টিআইবি।
টিআইবির বিশ্লষণ বলছে, ল্যান্ড রিফর্ম অ্যাক্ট-২০২৩ অনুযায়ী দেশে ব্যাক্তি মালিকানাধী জমির সীমা কৃষি জমির ক্ষেত্রে ৬০ বিঘা ও অ-কৃষি জমি ১০০ বিঘার বেশি হতে পারবে না। কিন্তু জামালপুর-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী তার হলফনামায় জমির পরিমাণ দেখিয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার বিঘা।
টিআইবি বলছে, বৈধ সীমার ওপরে ব্যক্তি মালিকানায় এমন জমি আছে বহু প্রার্থীর। দ্বাদশ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর ২৭ শতাংই কোটিপতি। একশ কোটির ওপরে সম্পদের মালিক ১৮ জন।
টিআইবির প্রতিবেদন বলছে, একাদশ সংসদের এমপিদের মধ্যে ৬০ জনের আয় বেড়েছে ৫০ শতাংশের ওপরে। ৬৭ জনের অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ৫০ শতাংশ। পাঁচ বছরের ব্যবধানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সীর আয় বেড়েছে দুই হাজার শতাংশ। অন্তত দুইশো শতাংশ আয় বেড়েছে আরও চার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর।
হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন প্রার্থীরা। অন্তত একজন মন্ত্রী প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা সম্পদের কোনো তথ্যই হলফনামাময় উল্লেখ করেননি।
টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তাদের কাছে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, সরকারের মন্ত্রিসভার অন্তত একজন সদস্যের নিজ নামে বিদেশে একাধিক কোম্পানি থাকার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু হলফনামায় তা দেখা যায়নি। এই মন্ত্রী ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন ছয়টি কোম্পানি এখনো বিদেশে সক্রিয়ভাবে রিয়েল স্টেট ব্যবসা পরিচালনা করছে, যার মূল্য দুই হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এই মন্ত্রী তার হলফনামায় বিদেশে থাকা সম্পদের ব্যাপারে তথ্য দেননি।
ওই মন্ত্রীর নাম জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেহেতু তথ্য গোপনের ব্যাপার রয়েছে এবং তিনি (মন্ত্রী) নিজে তা প্রকাশ করেননি, তাই টিআইবি তার নাম প্রকাশ করছে না। তবে সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষ যদি টিআইবির কাছে জানতে চায়, তাহলে তারা তথ্য-প্রমাণসহ তা দেবেন।
দেশের সম্পদ গুটিকয় মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে উল্লেখ করে টিআইবির চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল বলেন, হলফনামার তথ্য যাচাই করে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, সমাজে দুটো শ্রেণি তৈরি হচ্ছে। এক শ্রেণি অতি সম্পদশালী, আরেক শ্রেণি দিন-আনে দিন খায়। অল্প কিছু লোকের আগ্রাসী সংস্কৃতির মধ্যে চলে গেছে দেশ। এটা বিপজ্জনক।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, হলফনামা অনুযায়ী বছরে কোটি টাকা আয় করেন, এমন প্রার্থীর সংখ্যা ১৬৪ জন। তবে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদর্শিত সম্পদ কোনো উপায়ে অর্জিত, তা যাচাই করা হয় না।
তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন একজন প্রার্থী। সম্পদের হিসাবে এটাই সর্বোচ্চ।
বর্তমান সংসদে ৬২ শতাংশ ব্যবসায়ী রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আগের তিনটি এবং এবারের নির্বাচন মিলিয়ে সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। আর গত ১৫ বছরে নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ২১ শতাংশ।
নবম থেকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করেন টিআইবির তৌহিদুল ইসলাম, রিফাত রহমান ও রফিকুল ইসলাম।
টিআইবির ওয়েবসাইটে নবম থেকে দ্বাদশ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য সম্বলিত ড্যাশবোর্ডের উদ্বোধন করা হয় অনুষ্ঠানে।