উৎসবের আমেজে সফল নির্বাচনের পথে বাংলাদেশ

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। চলছে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি। ব্যস্ত সময় পার করছেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। পাঁচ জানুয়ারি সকাল আটটা পর্যন্ত চলেছে প্রচার-প্রচারণা। প্রার্থীরা ভোটারের মন জয়ে ঘুরেছেন দ্বারে দ্বারে। ভোটাররাও অপেক্ষায় তাদের রায় দিতে। তাই দেশজুড়েই নির্বাচন ঘিরে বইছে উৎসবের আমেজ। ভোট দেয়া ও ফল প্রকাশের মাধ্যমে শেষ হবে সেই উৎসবের। 

২৯৮ আসনে জোর লড়াই 

• বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ মোট ২৭টি রাজনৈতিক দল এবারের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। 

দলগুলো হলো- ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম, গণফ্রন্ট, জাকের পার্টি, জাতীয় পার্টি, জাতীয় পার্টি-জেপি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, তৃণমূল বিএনপি, ন্যালনাল পিপলস পার্টি(এনপিপি), বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ কংগ্রেস, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, সুপ্রিম পার্টি, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, ওয়ার্কার্স পার্টি ও সাম্যবাদী দল।

•  বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীগণ নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৬৩ আসনে, জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা লাঙ্গল প্রতীকে লড়ছেন ২৮৩ আসনে। 
•    তৃণমূল বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে ২৮০ টি আসনে। 
•    বিএনএম এই নির্বাচনে ৫৪টি আসনে আর বিএসপি ৭৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
•    বিএনএফ প্রার্থী দিয়েছে ৪৫ টি আসনে।
•    ১৪ দলীয় জোটে থাকা তরিকত ফেডারেশন প্রার্থী দিচ্ছে ৩৮ টি আসনে। 
•    দলগুলোর বাইরে নির্বাচন করছেন কয়েকশ’ স্বতন্ত্র প্রার্থী। 
•    সারা দেশের ২৯৯ আসনে মোট ১৯৭১জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। 

সুতরাং বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি বলেই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই। কোন রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে অংশ নেবে কি নেবে না সেটি সম্পূর্ণরূপে সেই দলের এবং দলের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত। কোন দলকে জোরজবরদস্তি করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো সম্ভব নয়। 

দেশি ও বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকে সরগরম নির্বাচন 

• নির্বাচন সুষ্ঠু হয়না এবং নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহল বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে আসছিলো। নির্বাচনে পর্যবেক্ষক আসবে না বলেও শোনা যাচ্ছিলো নানা মহলের কলরব। তবে সেই আশায় গুড়ে বালি। 
• তীব্র সমালোচনা করা যুক্তরাষ্ট্রও পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। 
• সেই লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইন্সটিটিউট (আইআরআই) ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউট (এনডিআই) এরই মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থান করছে।
•  দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যবেক্ষক হিসেবে আবেদন করেছেন মোট ১৫৬ জন। 
•  অন্যদিকে ইসি ৪ টি সংস্থা ও ৩৪ টি দেশের নির্বাচন কমিশনের ১১৪ জনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভোট পর্যবেক্ষণের জন্য। 
• নির্বাচন কমিশন জানাচ্ছে, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন, ডাচ, ইরাক, ফিলিস্তিন, জর্জিয়া, উগান্ডা, নরওয়ে, বুলগেরিয়া, কঙ্গো থেকে আগামী সাতই জানুয়ারির ভোট পর্যবেক্ষণের আবেদন করেছে।
• এছাড়া দেশি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানের ২০ হাজার ৭৭৩ জন পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ

• আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই উৎসবমুখর নির্বাচনি প্রচার জনগণকে নির্বাচনমুখী করার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। 
• কতিপয় বিরোধী দল বা জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনীহা প্রকাশ করা সত্ত্বেও ঘোষিত তফশিলে মেনে বিভিন্ন দল-জোট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র সংগ্রহ, জমা, যাচাই-বাছাই, প্রতীক বরাদ্দ ইত্যাদি কাজ সুসম্পন্ন হয়েছে। 
• একদিকে দলের, অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার ফলে প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। 
• দেশব্যাপী দলীয়, জোটভুক্ত, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নিজস্ব প্রচার-প্রচারণায় নানামুখী ইতিবাচক কৌশল গ্রহণ করেছেন। প্রধান প্রধান সড়ক, পাড়া-মহল্লায়, অলিতে গলিতে প্রার্থীদের পোস্টার ঝোলানোর দৃশ্য আনন্দ-উৎসবের আমেজ তৈরি করেছে। 
• গ্রাম-নগর-শহরের সর্বত্রই নির্বাচনি ডামাডোল বেজে উঠেছে। চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি লোকসমাগমে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত সরগরম। 
• জনগণের আস্থা অর্জনে প্রত্যেক প্রার্থী স্ব স্ব উদ্যোগে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। 

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতকরণে সচেষ্ট নির্বাচন কমিশন 

• নির্বাচনকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য ও অর্থবহ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ প্রয়োজনীয় লোকবলের রদবদলসহ গৃহীত পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসালাভ করেছে। 
• দেশি-বিদেশি সমালোচনার জবাব দিতে কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ছাড় দেওয়া হয়নি ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদেরও। 
• নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের দিনে সকালে ব্যালট পেপার পৌঁছানোর যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশবাসী ও দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় বৈশ্বিক অংশীজন ও দাতাসংস্থার পক্ষ থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় ২১ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক বেশ কয়েকটি পরিপত্র জারি করা হয়। 
• পরিপত্র অনুযায়ী, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ২৯ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন থাকবে। 
• ফৌজদারি কার্যবিধি ও অন্যান্য আইনের বিধান অনুসারে এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা ইনস্ট্রাকশন রিগার্ডিং এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ারের ৭ম ও ১০ম অনুচ্ছেদের বিধান অনুসারে সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালিত হবে। 
• রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রয়োজন অনুসারে উপজেলা বা থানায় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সশস্ত্র বাহিনী অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা প্রদান করবে।
• প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, সবার মিলিত প্রচেষ্টা ও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। দেশে ও বহির্বিশ্বে এ নির্বাচন প্রশংসিত হবে, জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে।
• সংবাদকর্মীরা স্বাধীনভাবে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে গোপন বুথ ছাড়া সবখানে অবাধে বিচরণ করতে পারবেন।
• নির্বাচনের দিন ভোটগণনা শেষ করে রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে ফলাফল না পৌঁছানো পর্যন্ত পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোটগ্রহণের দিন দণ্ডবিধির ১৭১ই ও ১৭১এফ ধারায় বর্ণিত অপরাধের তাৎক্ষণিক বিচারকার্য সম্পন্ন করার জন্য বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে গঠিত ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
• ভোটের দিন কিছু অসৎ উপায় অবলম্বনের চেষ্টা হয়ে থাকে ব্যালট কেড়ে নিয়ে সিল মারা, কেন্দ্র দখল, পেশিশক্তির ব্যবহার। এসব হলে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রমুখী হবেন না। এসব ক্ষেত্রে তাই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া হবে।