বেবিচেক দুর্নীতিতে ব্যবস্থা, এয়ারবাসের প্রস্তাব ভাবছে সরকার

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ৩৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী মানব পাচার, টেন্ডার, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী ফারুক খান। 

জানা গেছে, নানা অনিয়ম করে এরিমধ্যে দেশ ছেড়ে গেছেন বেবিচকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল খালেক। তিনি প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পালিয়েছেন কানাডায়। আর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুজ্জামানও দেড়শ কোটি টাকা নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এমন সাত কর্মচারীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া কথা জানান বেসাকরি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী। 

মঙ্গলবার সফররত যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যানি ম্যারি ট্রেভেলেইনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা জানান তিনি। 

মন্ত্রী বলেন, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে যারা পালিয়ে গেছে তাদের খুঁজতে সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে।

এমন দুর্নীতির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকৌশল বিভাগ, হিসাব শাখা, লাইসেন্স নবায়ন শাখা, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, সম্পত্তি শাখা, পুরনো মালামাল ক্রয়-বিক্রয় শাখা, কল্যাণ শাখায় অনিয়ম হচ্ছে। 

পাশাপাশি রাডার মেরামত, কেলিব্রেশন, এক্সপ্রোসিভ ডিটেনশন সিস্টেম স্থাপন, বোর্ডিং ব্রিজের স্পেয়ার পার্টস ক্রয়, খান জাহান আলী বিমানবন্দর উন্নয়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নয়ন, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ, কক্সবাজার বিমানবন্দর, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ, চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ, প্যারালাল টেক্সিওয়ে, রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান টার্মিনালের সম্প্রসারণ, কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন-সংক্রান্ত মেগা প্রকল্পে অনিয়ম হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

বেবিচক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই বেবিচক ও বিমানের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান করে আসছে দুদক। কোন কোন খাতে বেশি দুর্নীতি হয় সেই তথ্য উদঘাটন করে সংস্থাটি। এর মধ্যে বেবিচকে ৩৬টি খাত নিয়ে বেশি অভিযোগ ওঠায় এসব তদন্ত শুরু হয়েছে। 

এরিমধ্যে দুদক একটি তালিকা করেছে। তালিকায় বলা হয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ার কন্ডিশনার ডাক্ট স্থাপন, এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম আপগ্রেডেশন, বিমানবন্দরে কাউন্টার এবং কনভেয়ার বেল্ট স্থাপন, তার যন্ত্রাংশ সরবরাহ, নতুন বোর্ডিং ব্রিজ স্থাপন, পুরাতন বোর্ডিং ব্রিজে যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও স্থাপন, বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে এলইডি লাইট কেনা ও ফিটিংস, বাগান আলোকসজ্জা, এইচটি এবং এলটি সুইচগিয়ার স্থাপনকাজের নামে অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে।

তাছাড়া বিমানবন্দরের ফ্লোর মাউন্টেড এবং ওয়াল মাউন্টেড প্যানেল স্থাপন, বিমানবন্দরে বিভিন্ন সাইজের পাওয়ার কেবল সরবরাহ, এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন, রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রোন লাইট ও লাইট ফিটিংস সরবরাহ, আবাসিক ভবনে ইন্টারনাল ইলেকট্রিফিকেশন কাজ, সিএএবির নতুন সদর দপ্তরের ভবনের বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট সরবরাহসহ ইএম-সংক্রান্ত কাজ, টার্মিনাল বিল্ডিংসহ বিমানবন্দরের অন্যান্য ভবনের ডেকোরেশেন-সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইএম কাজ, বিভিন্ন স্থানে অ্যাপ্রোন মাস্ট লাইট স্থাপন, সিসিআর বিল্ডিং-সংশ্লিষ্ট সব ইএম কাজ, রানওয়ে লাইটিংয়ের জন্য বিভিন্ন সাইজের কেবল সরবরাহ ও সংস্থাপন কাজেও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে এয়ারবাস থেকে বাংলাদেশের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার কথা হয়। 

ওই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জানান, বাংলাদেশ ১০টি বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সেদিন ফরাসি সূত্রের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানায়, প্রশস্ত দৈর্ঘ্যের এ-৩৫০ মডেলের উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

এ বিষয়ে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী জানান, যুক্তরাজ্যের এয়ার বাস কেনার প্রস্তাবে সরকার আপাতত ১০টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করেছে। মূল্যায়ন কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

মন্ত্রী বলেন, শুধু বোয়িংয়ের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বি়ভিন্ন এয়ারক্রাফট থাকা প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যের প্রস্তাব ভালো হলে আমরা তাদের এয়ার বাস কিনতে পারি।

বিমানমন্ত্রী বলেন, বোয়িং এর চেয়ে কম মূল্য ও প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকায় সরকার এয়ারবাস কেনার প্রস্তাব বিবেচনা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বোয়িং কেনার প্রস্তাব দিয়েছে।

২০১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হয় বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত সম্পূর্ণ নতুন চতুর্থ ও শেষ বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ। ১৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চতুর্থ ড্রিমলাইনার অবতরণ করে।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ত্রুটিপূর্ণ বলে দাবি করেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী হুইসেল ব্লোয়ার স্যাম সালেহপৌর। 

তার অভিযোগ, বোয়িং-৭৭৭ এবং বোয়িং-৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ নির্মাণের সময় দ্রুততার আশ্রয় নেয়া হয়েছিল। এই সব উড়োজাহাজের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের ঝুঁকি বিপর্যয়কর মাত্রায় পৌঁছে গেছে।

তবে ড্রিমলাইনার নিয়ে এসব অভিযোগ তা সঠিক নয় বলে দাবি করছে সিভিল এভিয়েশন।

বিমানের বর্তমান বহরে আছে ২১টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে চারটি বোয়িং ট্রিপল সেভেন, ছয়টি বোয়িং সেভেন এইট সেভেন ড্রিমলাইনার, ছয়টি বোয়িং সেভেন থ্রি সেভেন এবং পাঁচটি ড্যাশ এইট মডেলের উড়োজাহাজ।

এর মধ্যে ট্রিপল সেভেন ও ড্রিমলাইনারগুলো টানা ১৬ ঘণ্টারও বেশি সময় উড়তে সক্ষম। এ ধরনের উড়োজাহাজ লং হউল হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে সেভেন থ্রি সেভেন উড়োজাহাজগুলো মধ্যম ও স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে ব্যবহার করা হয়। আর ড্যাশ এইট উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয় স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে।