সম্প্রতি রাসেলস ভাইপারের কামড়ে এক সাপুড়ের মৃত্যুর পর মারাত্মক বিষধর এই সাপ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে দেশে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে- ‘সাপের ছোবলে সাপুড়ের মৃত্যু', 'দেশে নতুন আতঙ্কের নাম রাসেলস ভাইপার’, 'ভারত থেকে আসা বিষধর রাসেলস ভাইপার ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে’, ইত্যাদি।
আর মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। সবমিলিয়ে রাসেলস ভাইপার এখন বাংলাদেশে এতোটাই আলোচিত যে, সার্চ ইঞ্জিন গুগল ট্রেন্ডিংয়ের শুরুতেই রয়েছে এই সাপের নাম।
তবে নেট দুনিয়ায় নানা আলোচনার মধ্যে গুজব আর বিভ্রান্তিও ছড়িয়ে পড়ছে খুব দ্রুতগতিতে। এতে আতঙ্ক বাড়ছে জনগণের, ছড়াচ্ছে দুশ্চিন্তাও। অনেকেই সাবধানতা অবলম্বন করছেন। অনেকেই বোঝার চেষ্টা করছেন এর প্রতিকার আছে কিনা।
চন্দ্রবোড়া বা উলুবোড়া সাপ বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের পরিচিত। প্রাচীন বাংলার বরেন্দ্র জনপদে এদের দেখা বেশি পাওয়া যেত। এরপর বিভিন্ন জেলাতেও বিস্তৃতি ঘটেছিল এই জাতের সাপের। সেই চন্দ্রবোড়া বা উলুবোড়া সাপই স্কটিশ সরীসৃপ বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিক রাসেলের নামানুসারে রাসেলস ভাইপার নামে পরিচিতি হয়।
কিন্তু পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্যের অভাবে বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল রাসেলস ভাইপার। এক সময় এদের দেখাই মিলতো না। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে দেশের দুএক জায়গায় এদের আবার দেখা যায়। ২০২১ সালের পর বাড়তে থাকে, এ বছর এদের দেখা মিলছে বেশি।
সাপ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গঙ্গা/পদ্মা অববাহিকা এবং গড়াইয়ে দুই কুলের এলাকাগুলোতে এরা ছড়িয়ে থাকতে পারে। এছাড়া ঢাকার কাছেও এখন দেখা মিলছে এই রাসেলস ভাইপারের। এরা সরাসরি বাচ্চা দেয় এবং একবারে গড়ে বাচ্চা জন্ম দেয় ২০ থেকে ৪০টি। ফলে রাসেলস ভাইপার দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে সারাদেশেই বিষধর এই সাপের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
রাসেলস ভাইপার নিয়ে ভুল ধারণা
রাসেলস ভাইপারের কামড় বাঁচার উপায় সম্পর্কে জানার আগে এই সাপ নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
অনেকেই বলে থাকেন রাসেলস ভাইপারের কোনো অ্যান্টিভেনম বা বিষ প্রতিষেধক ওষুধ দেশে নেই। এটি সম্পূর্ণ ভুল এবং অজ্ঞতাপূর্ন কথা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাসেলস ভাইপার কামড়ালে পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এটা আমদানি করা হয় ভারত থেকে। শুধু চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপারই নয়, গোখরা ও কেউটের বিষ প্রতিরোধেও কাজ করে এই অ্যান্টিভেনম। বাংলাদেশে বহু সাপে কাটা মানুষের প্রাণরক্ষা হয়েছে পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম দিয়ে।
কিন্তু আসল বিষয় হচ্ছে, বিষধর সাপে কাটা মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া। এটা যত দ্রুত করা যাবে ততোই ভালো। তা না হলে কোনো অ্যান্টিভেনমেই কাজ হবে না। আর গোখরা কাটলে পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিষ নামিয়ে ফেলা গেলেও, রাসেলস ভাইপারের ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টাও বিষ থাকতে পারে। তবে বিষ থেকে মুক্ত হওয়ার পরও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হানির আশঙ্কা থাকে। মেডিকেল কলেজগুলো ছাড়াও দেশের জেলা ও উপজেলা সদর হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম মজুদ আছে।
রাসেলস ভাইপারের বিষ এককভাবে বিনষ্টকারী মনোভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম বাংলাদেশে নেই। তবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারে এটা তৈরির প্রাথমিক ধাপের কাজ শেষ হয়েছে। গবেষকরা পুরোপুরি সফল হলে এটি হবে দেশে তৈরি প্রথম অ্যান্টিভেনম সিরাম।
রাসেলস ভাইপার নিয়ে আরেকটি ধারণা প্রচলিত যে, সব সাপের বিষ একই রকমের হলেও রাসেলস ভাইপারের বিষে রয়েছে পাঁচ থেকে ছয় প্রজাতির। এটাও সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কেননা কোনো সাপের বিষই একই উপাদানের হয় না। বিভিন্ন ভেনম/টক্সিক উপাদানের মিশ্রন থাকে।
আবার অনেকেই বলে থাকে, রাসেলস ভাইপার তেড়ে এসে কামড়ায় এবং এটি বিশ্বের এক নম্বর আক্রমণাত্মক সাপ। আর বিষের দিক দিয়ে পঞ্চম বিষধর। এগুলো সম্পূর্ণ ভুল ধারণা বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বিশ্বের সব থেকে আক্রমণাত্মক সাপ ব্ল্যাক মাম্বা। রাসেলস ভাইপার তেড়ে এসে কামড়ায় না, তবে ছোবল মারে। ভাইপারিডি পরিবারভুক্ত চন্দ্রবোড়া থাকে লম্বা বিষদাঁত, বিশ্বে যার স্থান দ্বিতীয়। এই দাঁত দিয়ে শিকারের দেহের গভীরে বিষ ঢেলে দিতে পারে।
সাপের জগতে হিংস্রতা আর আক্রমণের ক্ষিপ্রতায় তালিকায় রাসেলস ভাইপারের অবস্থান ঠিক কততম, তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও, এই সাপ যে মারাত্মক এটা নিঃসন্দেহ। এর আক্রমণের গতি এতটাই তীব্র যে, এক সেকেন্ডের ১৬ ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে ছোবল সম্পন্ন করতে পারে। তীব্রগতিতে স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠে আক্রমণকারী এই সাপ কিলিং মেশিন নামেও পরিচিত।
রাসেলস ভাইপার থেকে বাঁচার উপায়
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এক বিশ্লেষকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, রাসেলস ভাইপার কামড়ালে একশ মিনিটের মধ্যে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারলে ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়। কোবরা বা কেউটে কামড়ালে অনেক সময় টেরও পাওয়া যায় না, কিন্তু রাসেলস ভাইপার কামড় দিলে জায়গাটা সাথে সাথে ফুলে যায় এবং সাপটি চলে যায় না।
এজন্য সেজন্য কামড় দেয়ার পর সাপটা দেখা যায় বলে রোগী বা অন্যরা নিশ্চিত হতে পারে। একজন চিকিৎসক দ্রুত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করতে পারেন। সেটি হলে ঝুঁকিও কমে যায়। এ কারণেও এটি অন্য বিষধর সাপের চেয়ে কম আতঙ্কের।
রাসেলস ভাইপার কামড়ালে দ্রুত হাসপাতালে না পৌঁছতে পারলে বাঁচার উপায় নেই। ওঝা বা সাপুড়ের কাছে গেলেই বিপদ।
ভাইপারে দংশন করলে ক্ষতস্থানে ব্লেড, ছুঁড়ি দিয়ে কাটাকাটি করা অথবা মুখ দিয়ে শুষে রক্ত বের করার চেষ্টা করা যাবে না। সাপে কাটা রোগীকে এক তেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে নিলে বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
ভাইপার গোত্রের সাপ কামড়ালে শরীরের কোনো প্রকার বাঁধন বা গিট্টু না দিতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে অঙ্গহানীর আশঙ্কা আছে। বরং রোগীকে সাহস দিতে হবে। কামড়ের জায়গা বা অঙ্গ কম নড়াচড়ার চেষ্টা করতে হবে, যাতে দ্রুত বিষ না ছড়িয়ে পড়ে।
রাসেলস ভাইপারের সাম্প্রতিক বিস্তৃতির পেছনে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার কথা বলছেন অনেকে। জমি বা ক্ষেতে এই সাপ ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা। মানিকগঞ্জসহ কয়েকটি জায়গায় চরাঞ্চলে দেখা মিলেছে।
অনেকেই বলছেন, দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জমিতে এখন একাধিক ফসল হচ্ছে। তাই সেখান থেকে বিতাড়িত হয়েছে শিয়াল, খাটাশ, বেজি, গুইসাপের মতো সাপখেকো প্রাণী। যত্রতত্র মানুষের হাতে প্রাণ সংহার হওয়ায় ঈগল বা বাজপাখিও অস্তিত্বের সংকটে। এরাও ছিল সাপের শত্রু।
এদিকে গোখরা বা কেউটে প্রজাতির সাপও বিপন্ন হতে চলেছে। গোখরা সাপ রাসেলস ভাইপারের বাচ্চা খেয়ে ফেলে। এছাড়া দেশে তিন মৌসুমে ধান চাষ হওয়ায় ইঁদুরের উৎপাত বেড়েছে। রাসেলস ভাইপারের প্রধান খাবার ইঁদুর। এ কারণেই ভাইপার দ্রুত বংশবিস্তার করছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
তবে মানুষ একটু সাবধান হলেই সাপের কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৪ লাখেরও বেশি মানুষকে সাপে কামড়ায়। মৃত্যু সাত হাজারের বেশি মানুষের। এসব ঘটনা মোকাবিলায় বিশেষ করে কৃষকদের কার্যকর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
কৃষকরা গামবুট পরলে শক্ত প্রতিরক্ষা তৈরি করা সম্ভব। এ বুটগুলো আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী হওয়ায় এগুলো কৃষকদের নাগালেরর আওতায়।
এছাড়া উন্নত প্রাথমিক চিকিৎসা, অ্যান্টিভেনমের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং সাপের কামড় প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে ডাক্তার, নার্স ও স্থানীয় কমিউনিটির ক্লিনিকের কর্মরতদের প্রশিক্ষণে জোর দিকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে অ্যান্টিভেনমের প্রাথমিক ব্যবহার সম্পর্কে জানা।