বাল্যবিয়ে: কিশোরীদের স্বপ্ন যেভাবে ‘পরের ঘরে’ বন্দী

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ০৬:২১ পিএম

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর ভার্সিটি ঘাট থেকে যতো দূর চোখ যায়, কেবলই উত্তাল যমুনা। নৌকায় প্রায় ঘণ্টাখানেকের নদীপথ পাড়ি দিয়ে, তারপর দু-চাকার বাহনে চরের ধূ ধূ ধূলিপথ। চরের শান্ত নিভৃত এক গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘সুস্বাস্থ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র’। সেখানেই দেখা মিললো মোসাম্মৎ সাবেকুন নাহারের (১৯) সঙ্গে।মাত্র পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা সাবেকুনের চোখে এখনও একরাশ কৈশোরের সারল্য।

স্বপ্ন ছিলো পড়াশোনা শেষ করে একদিন শিক্ষক হবেন। কিন্তু বাবা-মায়ের জোরাজুরিতে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বসতে হয়েছিলো বিয়ের পিঁড়িতে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এখন তিনি মা হতে চলেছেন। 

সাবেকুন একা নন, তার বড়ো বোনেরও বিয়ে হয়েছে আঠারো ছোঁয়ার আগে। এই চরের প্রতিটি ঘরের গল্পই যেন সাবেকুনদের স্বপ্নভঙ্গের এক একটি নির্মম উপাখ্যান। 

এশিয়ায় শীর্ষে, বিশ্বে অষ্টম 

বাল্যবিয়ে কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি পুরো সমাজের এক গভীর ক্ষত। ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাল্যবিবাহের হারে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম, আর এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএ-এর বৈশ্বিক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে এখনও ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই। খুব কম বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসায় এদের বড়ো অংশই মা হচ্ছে অপরিণত বয়সে, যা ডেকে আনছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি। 

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি প্রতি এক হাজার মেয়ের মধ্যে ৭১ জনই এক বা একাধিক সন্তানের মা। আর মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলগুলোতে এই হার আরও ভয়াবহ। 

চরের সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মিডওয়াইফ তাহরিমা আকতার এবং চিকিৎসক ডা. জান্নাতুল পিয়া জানান, সপ্তম থেকে নবম শ্রেণিতে থাকতেই চরের সিংহভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ফলে এই কন্যাশিশুরা রক্তস্বল্পতা, পুষ্টিহীনতাসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। 

কনে হওয়ার জন্যই যেন জন্ম!

চরের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, যৌতুক প্রথা, মেয়ে বড়ো হলে ভালো পাত্র না পাওয়ার ভয় আর সামাজিক নিরাপত্তার অভাব—এসব কারণেই তারা দ্রুত মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতে চান। তবে বাল্যবিয়ে কেবল দারিদ্র্য বা চরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। 

ব্র্যাকের সোশ্যাল এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড লিগ্যাল প্রোটেকশন (সেলপ) কর্মসূচির ‘বর্ন টু বি আ ব্রাইড’ শীর্ষক ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন সমাজের এক উল্টো চিত্র দেখিয়েছে। দেশের ২৭টি জেলার দুই হাজার ৮০টি গ্রামের ৫০ হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত এই জরিপ বলছে, উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারেও বাল্যবিয়ের হার আশঙ্কাজনক। 

বাল্যবিয়ের হার 

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল ‘স্প্রিঙ্গার’-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধ এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে। প্রবন্ধটিতে বলা হয়, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি বড়ো অংশ মনে করে, মেয়েদের ‘অতিরিক্ত স্বাধীনতা’ ঝুঁকিপূর্ণ। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে মেয়েরা বেশি স্বাধীন হয়ে পড়বে—এমন মনস্তাত্ত্বিক ভয় থেকে অনেক পরিবার স্কুলজীবনেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। অনেকে আবার ‘ভালো পাত্র’ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় কম বয়সে বিয়ে দেওয়াকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন। 

মাধ্যমিকের মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

ব্র্যাকের জরিপ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ, যার মধ্যে সাত শতাংশেরই বয়স ১৫ বছরের কম। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করার দ্বারপ্রান্তে থাকা মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৬-১৭ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৬৩ শতাংশের বেশি। স্কুল থেকে ঝরে পড়া মেয়েদের চেয়ে পড়াশোনায় থাকা অবস্থায় সবচেয়ে বেশি (৫৬ শতাংশ) বাল্যবিবাহ হয়েছে। বিয়ের পর এই মেয়েদের সিংহভাগই আর কোনোদিন স্কুলে ফিরতে পারে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস-২০২৩’ এর দিকে তাকালে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বাল্যবিয়ের গ্রাফটি বেশ ওঠানামা করেছে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৪৬.৮ শতাংশ, ২০২০ সালে কমে দাঁড়ায় ৩৪.৬ শতাংশে, ২০২১ সালে ৩৩.৮ শতাংশ হলেও ২০২২ সালে তা আবার লাফিয়ে বেড়ে ৪২.৯ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৪৪.৪ শতাংশে পৌঁছায়। 

মুক্ত হতে লাগবে ২১৫ বছর!

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচেভেলে (ডিডব্লিউ)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে যেভাবে বাল্যবিয়ে কমছে (প্রতিবছর প্রায় ২ শতাংশ হারে), এই গতি বজায় থাকলে দেশকে সম্পূর্ণ বাল্যবিয়েমুক্ত করতে সময় লেগে যাবে প্রায় ২১৫ বছর! বিবিএসের হিসাব বলছে, কমার এই হার যদি দ্বিগুণও করা যায়, তবুও ২০৩০ সাল নাগাদ বাল্যবিবাহের হার ৩০ শতাংশের ওপরেই থেকে যাবে। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বড়ো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। 

এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ কী? 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ বলেন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কেবল আইন বা শাস্তি দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় প্রয়াস। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নীতিমালার সংস্কার, মেয়েদের উপবৃত্তি ও শিক্ষার প্রসার এবং সবচেয়ে বড়ো কথা—পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। যতোক্ষণ না সমাজ মেয়েদের ‘দায়’ বা ‘পরের ঘরের কনে’ ভাবা বন্ধ করছে, ততোক্ষণ সাবেকুনদের স্বপ্নগুলো এভাবে মাঝপথেই অধরা রয়ে যাবে। 

যমুনার চরে সূর্য ডুবছে। নদীর বুকে গোধূলির আলোয় সাবেকুনদের মলিন মুখগুলো মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাকে এভাবে শৈশবেই অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে কোনো টেকসই উন্নয়ন বা আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা সম্ভব নয়।

একাত্তর/এসি
বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কন্যা শিশু, যার বড় একটি অংশই জীবনের প্রারম্ভে বা অপ্রাপ্তবয়সে এই অন্ধকার জগতে পা রাখতে বাধ্য হচ্ছে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ট্রাফিকিং...
নতুন করে বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। গত ১৬ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকদের কাছে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
৯০২ কোটি টাকার অতিরিক্ত বাজেটের ঘাটতি এবং পরিচালনা সংক্রান্ত জটিলতায় আটকে আছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অত্যাধুনিক থার্ড টার্মিনাল। আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদানে নির্মিত এই...
পরিবেশ রক্ষা, কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে সরকার গত কয়েক বছরে জোরালো অভিযান চালিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার...
শারদীয় দুর্গোৎসবের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ দলের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ভেস্তে দিল বগুড়ার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়া শহরের...
আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলের অন্যায় ও গণহত্যার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেছেন, হাজারো ডিসেম্বর পেরিয়ে গেলেও শেখ হাসিনা আর কখনো বাংলাদেশে ফিরে আসার সুযোগ পাবেন...
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি, দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যকার সুদীর্ঘ কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও সুসংহতকরণ এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে...
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমরা যে যেই ধর্মেরই হই না কেন, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।’
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর