বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী চীন, তবে বাণিজ্য ঘাটতিও সবচেয়ে বেশি। তারপরও দুই দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার অপার সম্ভাবনা দেখছেন ব্যবসায়ী নেতা, অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিকরা। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর উপলক্ষে এ কথাই বলেছেন তারা।
রপ্তানিতে প্রথম আর আমদানিতে দ্বিতীয় চীন। তাই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম পরাশক্তিও তারা।
বাংলাদেশেরও বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন, আমদানির প্রধান উৎস। কিন্তু গ্লোবাল এক্সপোর্ট জায়ান্ট চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতিও সবচেয়ে বেশি।
কারণ চীনের আমদানি পণ্যের বাজারে হিস্যার ৩ হাজার ভাগের এক ভাগও নিতে পারেনি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রাপ্ত শুল্কমুক্ত সুবিধায় চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, চীন যেসব পণ্য আমদানি করে- আমার সেসব পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমাদের চীন থেকে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা উচিত।
অন্যদিকে দেশের ইজেডগুলোতে চীনা বিনিয়োগ চান এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, চীনের বিনিয়োগকারীরা যদি আমাদের দেশে বিনিয়োগ করে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে তাহলে অনেকটাই ঘাটতি পূরণ হতে পারে।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, দেশটির সাথে বাণিজ্য ঘাটতি সরল হিসেবে দেখা যাবে না। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিশাল ক্যানভাসে মেলাতে হবে প্রকৃত লাভের হিসেব।
তার মতে, চীন আমাদের কৌশলগত অংশীদার। তাই সামগ্রিক বিষয়টিকে আরও যত্ন নিয়ে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ও বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনায় চীনা ঋণ নিয়েও কথা হচ্ছে। তাই আমদানি-রপ্তানির ডলার নয়, দূরদৃষ্টির পাল্লায় এই সম্পর্ককে মাপতে চান বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রীর চারদিনের চীন সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এই সফরের লক্ষ্য দেশের উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ এবং ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা।
বেইজিং সময় সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশটির ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটটির।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল ইকোনমি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোসহ প্রভৃতি বিষয়ে ২০ থেকে ২২টি সমঝোতা স্মারকে সই হতে পারে।
মঙ্গলবার সকালে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিন লিকুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী সাংগ্রিলা সার্কেলে অনুষ্ঠেয় ‘সামিট অন ট্রেড, বিজনেস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অপরচুনিটিজ বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড চায়না’ শীর্ষক সম্মেলনে অংশ নেবেন। বাংলাদেশের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল সম্মেলনে যোগ দেবে।
দুপুরে প্রধানমন্ত্রী চাইনিজ পিপল’স পলিটিক্যাল কনসাল্টেটিভ কনফারেন্সের (সিপিপিসিসি) ১৪তম জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াং হুনিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। বিকেলে ঐতিহ্যবাহী তিয়েনআনমেন স্কয়ারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবেন। রাতে তিনি বেইজিংস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত নৈশভোজে যোগ দেবেন।
বুধবার প্রধানমন্ত্রী গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সাক্ষাতের আগে প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে একটি অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। একই স্থানে প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলসহ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন।
এরপর দুই দেশের সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে প্রায় ২০ থেকে ২২টির মতো সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হবে এবং কয়েকটি প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণা হবে।
সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চীনের রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের সমঝোতা; অর্থনৈতিক উন্নয়ননীতি সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা; বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সহযোগিতা; নবম চায়না ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ নিয়ে সমঝোতা; মেডিক্যাল ও পাবলিক হেলথ বিষয়ে সমঝোতা; রেডিও ও টেলিভিশন-সংক্রান্ত সহযোগিতা সমঝোতা।
একই দিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন।
১১ জুলাই দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা।