কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মাকসুদ কামালের সঙ্গে প্রভোস্টদের বৈঠক শেষে এ তথ্য জানিয়েছেন স্যার এফ রহমান হলের প্রভোস্ট রফিকুল ইসলাম।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, হলগুলোকে শান্ত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো হলেই পুলিশ প্রবেশ করছে না। তবে শহীদুল্লাহ হলের পাশে পুলিশকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে। শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্টের দায়িত্ব ভিসি নিয়েছেন। বাকি হলগুলোর প্রভোস্টদের হলের শিক্ষার্থীদের শান্ত রাখতে ভিসির পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখনই হল বন্ধের কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।
বিকেলে উপাচার্যের বাসভবনে বৈঠকে বসেন বিভিন্ন হলের প্রভোস্টরা। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষের পর এই বৈঠক ঢাকা হয়।
সোমবার দুপুরের পর ক্যাম্পাসে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। বিকেলে তা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও চাঁনখারপুল এলাকায়।
দুপুর আড়াইটার দিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে কোটা আন্দোলনকারীদের উপর প্রথম হামলা হয়। এ সময় আহত অবস্থায় ওই হল থেকে কয়েকজনকে বের হতে দেয়া যায়।
আর এই খবরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিল নিয়ে বিজয় একাত্তর হলের দিকে লাঠি সোঁটা নিয়ে এগিয়ে যায় কোটা আন্দোলনকারীরা।
একই সময় কোটা আন্দোলনকারীদের সূর্যসেন হল লক্ষ করে ইটপাটকেল ছুড়তে দেখা যায়।
এদিকে বেলা তিনটার দিকে রাজু স্মারক ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দিতে জড়ো হয় ক্যাম্পাসে। এক পর্যায়ে, ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও ইটপাটকেল ছোড়া হলে শুরু হয় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া।
পরে ছাত্রলীগের ধাওয়ায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় কোটা আন্দোলনকারীরা। এ সময় ভিসি চত্বরে অবস্থান নেয় ছাত্র লীগের নেতাকর্মীরা। বিচ্ছিন্নভাবে চলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। লাঠি পেটায় আহত হন কয়েকজন। এ সময় কর্মীদের থামানোর চেষ্টা করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।
এরপর বিকেলে ঢাকা মেডিকেল ও চাঁনখারপুল এলাকায় চলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। দুপুর থেকে চলা এই সংঘর্ষে দুই পক্ষের শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এদের অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
এর আগে কোটা আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদে সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করে আন্দোলনকারীরা।
বেলা বারোটার পর মিছিল নিয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে যোগ দেয় বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষাঙ্গনে ফিরে না যাবার ঘোষণা দেন তারা। বেলা বারোটার পর এমন স্লোগান দিয়ে ঢাকা মেডিকেল, বুয়েট, ঢাকা কলেজ ও ইডেন কলেজের কোটা আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হয়।
২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত কোটাপদ্ধতি বাতিল করে পরিপত্র জারি করে সরকার।
কোটা বাতিল করে সরকারের পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে রিট করেন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অহিদুল ইসলামসহ সাতজন। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর রুল দেন হাইকোর্ট। চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৫ জুন রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট।
পরে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন চেম্বার আদালত হয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে ৪ জুলাই। রিট আবেদনকারীপক্ষ সময় চেয়ে আরজি জানালে সেদিন আপিল বিভাগ শুনানি পিছিয়ে দেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রপক্ষকে নিয়মিত লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করতে বলা হয়। এ অবস্থায় কোটা পুনর্বহালসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে গত ৯ জুলাই আবেদন করেন দুই শিক্ষার্থী।
দুই শিক্ষার্থী ও রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন শুনানির জন্য ১০ জুলাই আপিল বিভাগে ওঠে। শুনানি শেষে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটার বিষয়ে পক্ষগুলোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। কিছু পর্যবেক্ষণ, নির্দেশনাসহ এ আদেশ দেয়া হয়। এই স্থিতাবস্থা চার সপ্তাহের জন্য উল্লেখ করে আপিল বিভাগ আগামী ৭ আগস্ট পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।
তবে আদালতের আদেশ প্রত্যাখ্যান করে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র ব্যানারে আন্দোলন চালিয়ে যান শিক্ষার্থীরা।
রোববার বিকেলে সরকারি চাকরিতে বীর মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিরা কোটা সুবিধা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-নাতনিরা পাবে-এমন বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রতিবাদে নিজেদের ‘রাজাকার’ বলে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করে কোটা আন্দোলনকারীরা।