কোটা সংস্কারের দাবিতে বুধবারও সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও করছে আন্দোলনকারীরা। এ সময় বিভিন্ন জেলায় পুলিশ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়া সমর্থকরা। কোথাও কোথাও সংঘর্ষ রূপ নিয়েছে রণক্ষেত্রে। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।
কোটা সংস্কারের দাবি ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বুধবারও উত্তাল ছিলো গাজীপুর। জেলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আন্দোলনে যোগ দেন। তারা দীর্ঘসময় গাজীপুরের রাজবাড়ী মাঠে অবস্থান নেন। পরে ধীরে ধীরে শিববাড়ী মোড় এলাকামুখী হন।
দুপুর ১২টার দিকে রাজবাড়ী মাঠে জড়ো হন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীদের সাথে মাঠে নামেন অভিভাবকরাও। এ সময় শিক্ষার্থীদের স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে রাজবাড়ী এলাকা। পরে দুপুর ২টার দিকে মহাসড়ক ধরে শিববাড়ী মোড় এলাকায় অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
এ সময় শিক্ষার্থীদের স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা। শিক্ষার্থীরা বলেন, কোটা অবশ্যই সংস্কার করতে হবে। অন্যথায় অচল করে দেওয়া হবে সব কিছু। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা এই আন্দোলন লাগাতার চালিয়ে যাব।
শেরপুরে কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ২০ জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ও টিয়ারসেল ছুঁড়েছে। এ সংঘর্ষের ঘটনায় শেরপুর জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র রঘুনাথ বাজার এলাকায় যান চলাচল ও দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। এলাকায় থমথমে বিরাজ করছে।
বিকেল তিনটায় শেরপুর সরকারি কলেজ ক্যাম্পাস থেকে কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীরা প্রথমে বিক্ষোভ মিছিলে বের করে শহরে প্রবেশ করে। এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রলীগের একটি মিছিল শহরে প্রবেশ করে। এ সময় আন্দোলনকারীদের সাথে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ বেঁধে যায়।
এ সময় পুলিশের হস্তক্ষেপে প্রথমে আন্দোলনকারীরা পিছিয়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর আবারও তারা শহরের নিউমার্কেট মোড় থেকে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে থানা মোড়ে অবস্থান নেয়। এতে পিছিয়ে যায় ছাত্রলীগ ও পুলিশ। পরবর্তীতে পুলিশ আবার সংঘবদ্ধ হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
গাইবান্ধায় কোটা আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সকাল ১১ টার দিকে শহরের পৌর পার্ক থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গাইবান্ধা জেলা শাখার ব্যানারে মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহর প্রদক্ষিণ করে। এ সময় পলিশ সুপারের কার্যালয়ের গেট ভাঙার চেষ্টা করে আন্দোলনকারীরা।
বিক্ষোভ মিছিলটি শহরের ডিবি রোডের ১ নং রেলগেটে গিয়ে অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে তারা উত্তেজিত হয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে ও ১২টি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়। পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষের পর থমথমে রয়েছে পুরো এলাকা।
এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা রেল লাইন অবরোধ করলে পুলিশ ও ছাত্র লীগের নেতাকর্মীদের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় দুপক্ষের অন্তত ২৫ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফেনীতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের দোয়েল চত্বরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের দাবি, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের এ হামলায় কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছেন। তবে, আহতদের নাম পরিচয় জানা যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কোটা সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা দোয়েল চত্বরে জড়ো হতে থাকে। এ সময় জেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। পুলিশের উপস্থিতিতে তারা শিক্ষার্থীদের মারধর করেন।
এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরাও শহরের বড় বাজারে অবস্থান নিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে রেজাউল হক নামে এক পুলিশ কনস্টেবল আহত হন। তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ঘটনার পরপরই পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জেও কোটা সংস্কারের দাবিতে সোনামসজিদ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে আন্দোলনকারীরা। সকালে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে তারা শান্তি মোড়ে অবস্থান নেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জেও বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে আন্দোলনকারীরা। দুপুর বেলা ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর ও জাল কুড়িতে অবস্থান নেয় কোটা আন্দোলনকারীরা। এতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ করেছে চাষাঢ়া ও প্রেসক্লাবের সামনে।
শরীয়তপুরে ছাত্রলীগ ও কোটা আন্দোলনকারীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বেলা ১২ টার দিকে জাজিরায় পদ্মাসেতু সংলগ্ন জমাদ্দার মোড়ে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ৩০ মিনিট চলা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় আন্দোলনকারীরা পিছু হটলে সাড়ে ১২ টার দিকে সড়কটির নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্রলীগ।
এর আগে বুধবার সকাল ১০ টার দিকে পদ্মা সেতু টোল প্লাজার সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগের প্রতিরোধ পিছু হটে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন রয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। এই ঘটনায় কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ ছিলো।
টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব গোল চত্বর এলাকায় অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি পালন করেছে কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এতে বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে যানবাহন চলাচল। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়।
পরিবহন চলাচল না করায় বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল আদায় বন্ধ রাখেন সেতু কর্তৃপক্ষ। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। এ সময় পুলিশ তাদেরকে সড়ক ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করলেও শুনেনি শিক্ষার্থীরা। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা সড়ক থেকে চলে যাওয়ায় যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।
পটুয়াখালীতে বিক্ষোভ মিছিল ও গায়েবানা জানাজা পড়েছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় গেটের সামনে মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। পরে কোটা আন্দোলনে নিহতদের গায়েবানা জানাজা পড়ে কর্মসূচি শেষ করে।