চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের কাছ থেকে পাওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে ৫৪টি মন্ত্রণালয়ের ১২৯টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
শুক্রবার (৬ জুন) সন্ধ্যায় ঈদুল আজহা উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি এই তথ্য জানান।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, বাস্তবায়ন করা সুপারিশগুলোর চুম্বক অংশগুলোর মধ্যে আইন ও বিচার বিভাগ মোট ৩৩টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবুনালস) অ্যাক্ট ১৯৭৩ সংশোধন ও পুর্নগঠন করে আইনটি আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন ও জারি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এর অধীনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ইতিহাসে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, দেওয়ানি কার্যবিধির সংশোধন করা হয়েছে। যার ফলে এখন বাদিকে আর দিনের পর দিন সশরীরে আদালতে যেতে হবে না। একেকটি দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে আগে যতো সময় লাগতো, এই সংশোধনীর ফলে সময়সীমা অর্ধেকে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করছি।
তিনি বলেন, দেশের এক হাজারের বেশি অবকাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানের নাম পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাবা-মা-ভাই-বোন-আত্মীয়স্বজনের নামে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। তার মধ্যে ছিল সেনানিবাস, বিমানঘাঁটি, নৌ-বাহিনীর জাহাজ, মেগাসেতু, সড়ক, স্থাপনা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, গবেষণাকেন্দ্র- আরও বহু কিছু। এগুলো সব নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করা হয়েছে। প্রবাসী ভাই-বোনদের অনেকদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাওয়ার অব অ্যার্টনি বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে। এখন পুরনো পাসপোর্টে ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড স্টিকার’ থাকলে কিংবা জন্মসনদ থাকলে বিদেশ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে পারবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে আইনি সহায়তা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বিস্তার করা হবে। বছরে এখন গড়ে ৩৫ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়, আমাদের লক্ষ্য এটিকে দুই লাখ মামলায় উন্নীত করা। মামলা দায়েরের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যাদের বিরুদ্ধে মামলার কোনো ভিত্তি নেই তাদের বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যোগ করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি দেশের মানুষকে লুটপাটতন্ত্র থেকে বের করে আনতে। বিগত ১৬ বছরে উন্নয়নের নামে মেগা প্রকল্পগুলো যেন হয়ে উঠেছিল মেগা ডাকাতির প্রকল্প। আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পুনঃরায় মূল্যয়ন করে দেখেছি যে প্রায় সব প্রকল্পেই ভৌতিক ব্যয় ধরা হয়েছে। শুধুমাত্র সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, রেল মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ-এই পাঁচটি বিভাগেই ব্যয় সংকোচ করা হয়েছে ৪৬ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা।
এই টাকা দিয়ে জ্বালানি খাতে সমস্ত বকেয়া মিটিয়ে দিয়ে বকেয়ার পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করে সব ধরনের ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের অগ্রাধিকার।
দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে আমাদের গুরুত্ব দিতেই হবে। তা না হলে এদেশকে আমরা যে স্থানে নিয়ে যেতে চাই সেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ব্যাপারে রাজনৈতিক দল ও জনগণ আমাদের সর্বাত্মক সমর্থন করছেন। সকলের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ, কৌতূহল আমাদের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে ৩০টি মূল সংস্কারকাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই ১৮টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে এবং দেশি-বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। গত অক্টোবর হতে মার্চ পর্যন্ত নেট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মোট ৭৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫-এ নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক সেশনের মাধ্যমে ব্যবসায়ী চেম্বার, ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ইনভেস্টমেন্ট সামিটে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও আলোচনার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যাতে করে পরবর্তীতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা যেন বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গড়তে নিজেদের প্রতিশ্রুতির কথা জানাতে পারেন। সম্প্রতি চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী চীনের ১০০টি কোম্পানির প্রায় দেড়শ বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুতই বড় আকারের বিদেশি বিনিয়োগ দেখতে পাবো।
সম্প্রতি আমি চীন, কাতার, জাপানসহ কয়েকটি দেশ সফর করেছি। এসব সফরেও বিভিন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছি। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি যাতে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় সে চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে কাতারের বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের লাখো লাখো ছেলে-মেয়েরা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। তাদের জন্য প্রযুক্তি শিক্ষা ও বিদেশি ভাষা শিক্ষা চালু করতে আমরা কাতার চ্যারিটির সাহায্য চেয়েছি।
গত মাসে জাপান সফর প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এ সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে বাজেট সহায়তা ও রেলপথ উন্নয়নের জন্য এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ ঘোষণা করেছেন। দ্বিপাক্ষিক তিনটি চুক্তিপত্র বিনিময় হয়েছে। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও অন্যান্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে ছয়টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে।
বাংলাদেশের কর্মশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জাপানে তাদের কর্মসংস্থান সহজতর করার লক্ষ্যে জাপানের সঙ্গে আমরা দুটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছি। জাপানের শ্রমিক সংকট রয়েছে। আমরা আগামী পাঁচ বছরে জাপানে এক লক্ষ কর্মী পাঠানোর চুক্তি সই করেছি। এর চাইতেও আরও বেশি শ্রমিক ক্রমাগতভাবে পাঠানোর আয়োজন করে এসেছি।