২০২৪ সালের বিপ্লব কেবল অন্যায় প্রত্যাখ্যান ছিলো না, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্জন্মের নির্দেশনা ছিলো বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা (সেলপ) কর্মসূচির উদ্যোগে ‘যথাসময়ে বিচার নিশ্চিত করতে পারিবারিক আদালতের পদ্ধতিগত জটিলতা নিরসন’ শীর্ষক একটি জাতীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি বলেন, আজ বিচার বিভাগ একমাত্র সম্পূর্ণ সচল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যা স্বাধীনতায় দৃঢ়, ন্যায্যতায় অটল, সেবায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু এ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যসব সংস্কার টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে বিচারব্যবস্থার গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর।
ব্র্যাকের উদ্যোগে সোমবার (১৪ জুলাই) ব্র্যাক সেন্টারে এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় কর্মশালায় বিচারব্যবস্থার পদ্ধতিগত সংস্কারের সুপারিশ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে পারিবারিক আদালতের পদ্ধতিগত জটিলতা দূর করার আহ্বান জানান প্রধান বিচারপতি।
তিনি বলেন, কার্যকর নাগরিকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক আইনগত সংস্কারগুলো কেবল আধুনিকায়নের জন্য নয়, বরং ন্যায়বিচারকে সহজপ্রাপ্য করে তোলাই এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
লিগ্যাল এইড আইনের সংশোধনকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি বলেন, এর ফলে এখন মামলার আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালু করা হয়েছে। এটি বিরোধপূর্ণ বিচারপদ্ধতি থেকে সমঝোতার পথে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ এবং সেলপ ও জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি (জিজেডি) কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন কুষ্টিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সোনালী রানী উপাধ্যায় এবং সাতক্ষীরার সিনিয়র অ্যাসিস্টেন্ট জাজ মো. তরিকুল ইসলাম।
পারিবারিক আদালতের দীর্ঘসূত্রতার কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৭৪ হাজার ২৫৯টি মামলা বিচারাধীন, যার মধ্যে পাঁচ হাজার ৩৪টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। তবে একই সময়ে, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে ১০ হাজার ৮৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
তিনি এটিকে বিচারক এবং বার নেতৃবৃন্দের ইতিবাচক জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ফল বলে উল্লেখ করেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, বিচার প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগত অদক্ষতা দূর করতে দেওয়ানি কার্যবিধির সাম্প্রতিক সংশোধনের মাধ্যমে মামলা পরিচালনা কার্যক্রমের স্তর কমানো হয়েছে, যা অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ও জটিলতা কমাবে।
বিচার বিভাগের সঙ্গে ব্র্যাকের অংশীদারিত্বেরও প্রশংসা করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তিনি বলেন, ব্র্যাকের উদ্যোগে আয়োজিত বিচারক, আইনজীবী, কোর্ট কর্মচারী এবং বিচারপ্রার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত পাঁচটি আঞ্চলিক কর্মশালায় মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। যেখানে বিচার কার্যক্রমে সনাতন সমন জারির প্রক্রিয়া, মামলা মুলতবির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অসংগঠিত মামলা ব্যবস্থাপনা, অপ্রতুল মানসিক সহায়তা এবং আদালতের অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কথা ওঠে এসেছে।
ব্র্যাকের সহায়তায় সুপ্রিমকোর্টে স্বাস্থ্যকর জেন্ডার সংবেদনশীল টয়লেট স্থাপনের জন্য তিনি ব্র্যাককে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, অন্যান্য মহানগর ও বিভাগীয় আদালতেও এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন ছাড়া কোনো বিচারব্যবস্থা সময়সূচি, জনবল বা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারে না। এই কাঠামোগত স্বাধীনতা বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং বৃহত্তর শাসনব্যবস্থার সংস্কার রক্ষায় অপরিহার্য।
আদালতে প্রযুক্তির ব্যবহারের গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল কার্যতালিকা, মুলতবি পর্যবেক্ষণ এবং এসএমএসের মাধ্যমে সমন জারির পাইলট প্রকল্পে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে এবং এটি এখন পারিবারিক আদালতেও চালু হবে। ভবিষ্যতে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত ডিজিটাল তলব এবং একটি বিচারিক সহায়তা ডেস্ক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান প্রধান বিচারপতি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব বলেন, পারিবারিক আদালতে ন্যায়বিচার মানে জয় বা পরাজয় নয়; এটি মূলত একটি নিরাময় প্রক্রিয়া। আর এই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আমাদের এটিকে আরও সহজপ্রাপ্য, সহানুভূতিশীল ও দ্রুততর করতে হবে।
তিনি এই কর্মশালাকে একটি ন্যায়সঙ্গত, দক্ষ এবং জনগণকেন্দ্রিক পারিবারিক বিচারব্যবস্থা গঠনে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিচারপতি ফারাহ মাহবুব বলেন, এখানে বিচার বিভাগ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনি সেবা প্রদানকারী সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছেন। এটি বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারকে ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে সবার সম্মিলিত প্রতিশ্রুতিকে পুনর্ব্যক্ত করছে।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, একটি সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজে প্রতিটি নারী ও কিশোরী ক্ষতিকর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ না থেকে তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্র্যাকের বহুমাত্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে জনগণকে সম্পৃক্ত করা, তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত ও আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা উল্লেখযোগ্য। সাধারণ মানুষ, বিশেষত নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, এমন বাধাগুলো দূর করতে কাজ করছে ব্র্যাক।
স্বাগত বক্তব্যে ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, আমরা একসঙ্গে শুধু আদালতের পদ্ধতিগত জটিলতা দূর করতে কাজ করছি না, বরং বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছি। বিচারপ্রার্থী ভুক্তভোগীদের মর্যাদা রক্ষা করে একটি ন্যায়সঙ্গত, সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ার কাজ করছি।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ব্র্যাকের সেলপ কর্মসূচির লিগ্যাল এইড অ্যান্ড পলিসি এডভোকেসি বিভাগের লিড এটিএম মোরশেদ আলম।
কর্মশালায় বিচার বিভাগ, নীতিনির্ধারক, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা অংশ নেন।
অংশগ্রহণকারীরা দেশের পারিবারিক আদালতগুলোতে সবার জন্য সময়মতো এবং ন্যায়সংগত বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।