আলোর উৎসবে শ্যামার আরাধনা আজ

অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভ শক্তির বিজয় ও অন্ধকারকে দূর করে শুভ ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠায় আলোর উৎসব আজ। আজ দীপাবলি।

বঙ্গদেশে কার্তিক মাসে এই দীপবলিতে এই কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। যা ‘দীপান্বিতা কালীপূজা’ নামে খ‍্যাত। কালীর অপর নাম শ্যামা। এই নামে এই তিথিতে পূজিত হন কালী।  এই ভূমিতে বহু প্রাচীনকাল থেকেই শাক্ত সাধনার প্রচলন আছে। 

দীপাবলি

শ্রী রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার অকাল বোধন করে। পরে লঙ্কায় গিয়ে রাবণ বধ করে বিজয়া দশমীতে। এরপর সীতাকে উদ্ধার করে ফেরেন অযোধ্যায়। 

১৪ বছর বনবাসের পর সীতাকে সঙ্গে নিয়ে রাম ও লক্ষ্মণ যখন অযোধ‍্যায় ফেরেন, প্রজারা তাদের এমন রাজকীয় প্রত‍্যাবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে বিজয়ার পরবর্তী কার্তিক মাসের অমাবস্যার দিনে ঘরে ঘরে আলো জ্বালিয়ে দীপাবলি উৎসব পালন করেন।

হিন্দিবলয়ে এই উৎসবের নাম ‘দিওয়ালি’। দিওয়ালিতে সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা হয়ে থাকে। 

পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে জানা যায়, আশ্বিন মাসের নরক চতুর্দশীর দিন ভগবান বিষ্ণু প্রবল পরাক্রমশালী নরাসুরকে বধ করেছিলেন। তার বধের মধ্য দিয়েই বসুন্ধরার সৃষ্টি। তাই এই বসুন্ধরার জন্মের তিথি উপলক্ষ‍ে গৃহস্থরা নিজ নিজ ঘরদোর সব পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করে রাখে। সন্ধ‍্যায় প্রদীপ প্রজ্বালন করে নতুনের আহবান জানানো হয়।

সারা উত্তর ও মধ‍্য ভারতজুড়ে যখন দিওয়ালি উৎসব পালিত হয়, বাঙালি সনাতন ধর্মাবম্বলীরা আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে কালীপূজা উদযাপন করেন। কালীপূজা মূলত অশুভ শক্তিকে বিতাড়িত করে শুভ শক্তির সাধনা। শুধু আলো জ্বালিয়েই উৎসবের উদযাপন শেষ হয় না। আতশবাজি পোড়ানোর ধুমও দেখা যায়। অশুভ শক্তি বিতাড়নের এটাও এক প্রাচীন আচার।

কালীপূজা

জ‍্যোতির্বিদেরা মনে করেন, কার্তিক মাসের অমাবস‍্যা বছরের সবচেয়ে তমসাঘন রাত। আকাশে হিমের পরশ পড়তে থাকে। এই ঘন আঁধার রাতেই নাকি ভূতপ্রেতরা নৃত‍্য করতে বেরিয়ে পড়ে। এমন দুই প্রেত, ডাকিনী ও যোগিনীকে দেখা যায় কালী মায়ের মূর্তির পাশে।

পৌরাণিক মতে, এরা খুবই ভয়ংকর। তাই অশুভ শক্তি হিসেবে তারাও পূজিত হয় কালীমূর্তির সঙ্গে। ‘স্কন্দপুরাণ’ মতে দেখা যায়, দেবী চণ্ডী রক্তবীজ নিধন করার সূত্রে কালীমূর্তি ধারণ করেছিলেন। রক্তবীজের প্রতিটি রক্তফোঁটা থেকে অসুরের জন্ম হয়েছিল। শেষে চণ্ডী ভয়ংকরী হয়ে উঠে কালীমূর্তি ধারণ করে সমস্ত রক্ত পান করলে দানবকুলকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়।

‘স্কন্দপুরাণ’ ছাড়াও অন‍্যান‍্য পৌরাণিক কাহিনিতে দেখা যায় শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামের দুই অসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন আদ‍্যাশক্তির কোষ থেকে উদ্ভূত দেবী কালী। কোষ থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে তাঁর আরেক পরিচয় ‘দেবী কৌশিকী’।

কালীর অনেক রূপের কথা পুরাণে আছে। বঙ্গদেশের বিভিন্ন প্রাচীন মন্দিরে তিনি করুণাময়ী, ব্রহ্মময়ী, ভবতারিণী নামে পূজিত হয়ে থাকেন। ইতিহাস বলে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের মাধ‍্যমেই বাংলায় কালীপূজার প্রচলন শুরু হয়। সাধারণত গৃহস্থ বাড়িতে ব্রাহ্মণ‍্যমতে কালীপূজা সম্পন্ন হলেও বহু মন্দির এবং শ্মশানে তান্ত্রিক মতে তিনি পূজিত হন।

এদিন সারাদেশে আন্দোৎসবে শ্যামা পূজা অনুষ্ঠিত হবে। তবে রাজধানীর শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও সূত্রাপুরসহ পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় থাকবে জমকালো আয়োজন। এছাড়া রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দিরে কালীপূজার আয়োজন রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী উদযাপন

দীপাবলি শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের উৎসব নয়, বিশ্বের ১৭টি দেশে হিন্দু, জৈন, শিখ ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে ১০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ নিষ্ঠায় পালন করেন। 

  • ভারতে এটি ‘দিওয়ালি/দীপাবলি’ নামে পরিচিত, যেখানে হিন্দু, জৈন ও শিখরা লক্ষ্মীপূজা, আতশবাজি ও মিষ্টি বিতরণ করেন। 
  • বাংলাদেশে ‘দীপান্বিত কালীপূজা’ হিসেবে বাঙালি হিন্দুরা আলো-বাজি ও শ্যামাপূজা করেন। 
  • নেপালে ‘তিহার/দীপাবলি’ নামে হিন্দুরা ভাই-বোনের টিকা ও কাক পূজায় দুই কোটির বেশি অংশগ্রহণ করে। 
  • শ্রীলঙ্কায় তামিল হিন্দুরা তেলের স্নান ও মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে উদযাপন করে। 
  • পাকিস্তানে সিন্ধু হিন্দুরা রামায়ণীয় নাটক ও আলোকসজ্জায় মিলিত হয়। 
  • ম্যানমারে হিন্দু-বৌদ্ধরা ‘দীপাঙ্গম’ উৎসবে মন্দিরে প্রদীপ ও ড্রাগন বোটে মানুষ অংশ নেয়। 
  • ইন্দোনেশিয়ায় (বালি) হিন্দুরা বারোগং নৃত্য ও ফুলের প্রদীপে যোগ দেয়। 
  • মরিশাসে ভারতীয় হিন্দুরা জাতীয় ছুটিতে সব ধর্মের অংশগ্রহণে উদযাপন করেন। 
  • ফিজিতে ভারতীয় হিন্দুরা জাতীয় ছুটি ও স্কুল অনুষ্ঠানে একত্রিত হন। 
  • মালয়েশিয়ায় তামিল হিন্দুরা রাজকীয় আলোকসজ্জা ও কলিংগায় অংশ নেয়। 
  • সিঙ্গাপুরে হিন্দুরা লিটল ইন্ডিয়ার মেলা ও আতশবাজিতে লাখ মানুষ যোগ দেয়। 
  • যুক্তরাজ্যে ভারতীয় হিন্দুরা ট্রাফালগার স্কোয়ারের আলোকসজ্জায় উদযাপন করে।
  • যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়-দক্ষিণ এশীয়রা টাইমস স্কোয়ার লাইটিং ও স্কুল ছুটিতে প্রায় ৪০ লাখ অংশগ্রহণ করে। 
  • কানাডায় ভারতীয়রা ওটোয়া পার্লামেন্টে প্রায় আট লাখ মানুষ উৎসবে মাতে। 
  • অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয়রা সিডনি অপেরার আলোকসজ্জায় প্রায় পাঁচ লক্ষ যোগ দেয়।
  • দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় হিন্দুরা ডারবানের মিষ্টি মেলায উদযাপন করেন। 
  • ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে ভারতীয় হিন্দুরা জাতীয় ছুটি ও চাটুর্নী নৃত্যে অংশ নেয়। 
  • মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় ৯৫% উদযাপন হয়, ভারতীয় ডায়াস্পোরার কারণে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে। জাতীয় ছুটি আছে মরিশাস, ফিজি, গায়ানা ও সুরিনামে। ইউনোসকে ২০২৩ সালে এটিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অস্পষ্ট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

এই উৎসবের বৈচিত্র হলো- হিন্দুতে রামের বিজয়-শ্যামাপূজা, জৈনে মহাবীর নির্বাণ, শিখদের গুরু হরগোবিন্দের মুক্তি।