পরিবেশ রক্ষা, কৃষিজমি সংরক্ষণ এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে সরকার গত কয়েক বছরে জোরালো অভিযান চালিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৩০৯টি ইটভাটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। আরও বহু ভাটা বন্ধ করা হয়েছে প্রশাসনিক অভিযানে। ১১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই পরিবেশগত উদ্যোগের বিপরীতে সামনে এসেছে আরেকটি বড় শ্রমিক সংকট। হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়া লাখো শ্রমিকের জীবিকার অনিশ্চয়তা।
একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে এগোচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় ইটভাটা বন্ধ করছে। পরিবেশ সুরক্ষা করতে গিয়ে প্রান্তিক শ্রমজীবীরা জীবিকা হারাচ্ছে। বিকল্প কর্মসংস্থান, পুনর্বাসন কিংবা দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া ইটভাটা বন্ধ হওয়ায় শ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে, পরিবেশ রক্ষার এই পদক্ষেপ কতটা “ন্যায্য রূপান্তর” নিশ্চিত করছে?
জলবায়ু বিপর্যয় থেকে ইটভাটার শ্রমবাজারে
ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়ার কেএমবি-২ ইটভাটায় আগুন মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন এবাদুল ইসলাম। প্রায় ২৪ বছর ধরে এই পেশায় আছেন তিনি। বাবার কাছ থেকে কাজ শিখে তার ছেলে শাহীনুর রহমানও এখন একই পেশায় যুক্ত।
এবাদুলের বাড়ি উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায়। নদীভাঙন, লবণাক্ততা আর ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষিকাজ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে সেখানে। ফসলের জমিতে নোনা পানি ঢুকে যাওয়ায় বছরের বড় সময় কাজ থাকে না। তাই বাধ্য হয়েই ঠাকুরগাঁওয়ে এসে ইটভাটায় শ্রম বিক্রি করেন তিনি।
এবাদুল বলেন, 'আমাদের ওখানে নদীভাঙন। ফসলের মাঠে নোনা পানি ওঠে। তখন আমাদের কোনো কাজ থাকে না। এজন্য আমরা ঠাকুরগাঁও এসে ভাটার কাজ করি। আমাদের গ্রামের সবাই এই কাজ করে'।
ইটভাটার মাঠেই তার পরিবারের বসবাস। ইট দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঘর, যেখানে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ঘর ধসে পড়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তবু এটিই তাদের একমাত্র আশ্রয়।
ভাটা বন্ধ, জীবিকা বন্ধ
২০২৩ সালে ঠাকুরগাঁও সদরের ইয়াকুবপুরে অনুমোদনহীন কেএমবি ইটভাটা বন্ধ করে প্রশাসন। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কিলোমিটারের মধ্যে হওয়ায় আইন অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ে সেখানে কাজ করা প্রায় ২৫০ শ্রমিকের ওপর।
কুসলা রানী সেই ভাটার একজন সাবেক শ্রমিক। প্রতিদিন ২৫০ টাকা মজুরিতে সংসার চালাতেন। এখন অনিয়মিত কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। দাদন বা অগ্রিম ঋণের ফাঁদে পড়ে প্রতিবন্ধী সন্তানসহ চার সদস্যের তার পরিবার এখন চরম দুর্দশায়। অগ্রীম ঋণ বা ‘দাদন’ এর ফাঁদে পরে বেশি শ্রমে কম মজুরি পাচ্ছেন কুসলা রানী।
তিনি বলেন, মৌসুমে এক বিঘা জমির ধান কাটলে ৪ হাজার টাকা মজুরি পাই। কিন্তু মহাজনের কাছে অগ্রিম টাকা নিলে ১ হাজার ৫০০ টাকায় কাজ করতে হয়। ইটভাটা খুলে দিলে শ্রমিকদের জন্য ভালো হতো।
একই অবস্থা জোসনা বেগমের। স্বামী মারা যাওয়ার পর ইটভাটার কাজই ছিল তার একমাত্র ভরসা। এখন কাজ না থাকায় দিনমজুরি জোটে না প্রতিদিন।
তিনি বলেন, ‘খুব কষ্টে আছি। কোনোদিন কাজ পাই, কোনোদিন পাই না। বসে থাকতে হয়’।
ইটভাটার মালিকরাও অনিশ্চয়তায়
শুধু শ্রমিক নয়, ইটভাটা বন্ধের প্রভাব পড়েছে মালিকপক্ষের ওপরও। অনেক মালিক ব্যাংকঋণ, যন্ত্রপাতি বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক দায় নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
কেএমবি ইটভাটার ম্যানেজার মোহাম্মদ রাজু বলেন, “চট করে এটা বন্ধ করা যায় না। প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও সুযোগ দিতে হবে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মালিক অনেক ক্ষতিগ্রস্ত।”
এই বাস্তবতা দেখায় সমস্যাটি শুধু পরিবেশ বনাম শিল্প নয়; এটি একটি জটিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রশ্ন।
অবৈধ ইটভাটার বিস্তার ও পরিবেশগত চাপ
২০২৩ সালে দেশে মোট ইটভাটার সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৮৮১টি। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৩৩টি ছিল অবৈধ। এখন সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। প্রতি ইটভাটায় গড়ে ২৫০ জন শ্রমিক কাজ করলে প্রায় ২৫ লাখ শ্রমিক কাজ করে ইটভাটায়।
অবৈধ ইটভাটাগুলো সাধারণত কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবসতির কাছে গড়ে ওঠে। এসব ভাটায় পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বায়ুদূষণ, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন উজাড় এবং কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. তামিম হোসেন বলেন, “যে ইটভাটাগুলো অবৈধভাবে চলছে, স্কুলের সন্নিকটে বা আইনকানুন লঙ্ঘন করছে—সেগুলো আমরা ভেঙে দিচ্ছি।”
পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই অভিযান প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী। কিন্তু প্রশ্ন হলো কাজ হারানো শ্রমিকদের জন্য কি কোন বিকল্প কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে?
তৈরি হয়নি বিকল্প বাজার
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান স্বীকার করেছেন, শুধু ইটভাটা ভাঙলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ইটভাটা ভেঙেছি। কিন্তু এর প্রভাব পড়েনি। কারণ আমরা ইটের বিকল্প বাজার তৈরি করতে পারিনি’।
ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক, হালকা নির্মাণসামগ্রী বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা এখনো সীমিত। শ্রমিকদের বড় অংশ জানেই না ‘ব্লক’ কীভাবে তৈরি হয়।
শ্রমিক বাবর আলী বলেন, ‘ব্লক ইট সম্পর্কে সরকার বলছে, কিন্তু আমি তো শিখিনি। এটা কীভাবে তৈরি করতে হয়, সেটা জানি না’। অর্থাৎ শুধু প্রযুক্তি বদল নয়, দক্ষতা বদলও জরুরি। সেই সাথে দরকার সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপ।
এনডিসি-৩ এবং ‘জাস্ট ট্রানজিশন’
বাংলাদেশের জলবায়ু কর্মপরিকল্পনার (এনডিসি-৩) অধ্যায় ৭-এ ইটভাটা খাতকে ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ বা ন্যায্য রূপান্তরের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে-পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে এই পরিকল্পনার কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। জাস্ট ট্রানজিশন বাংলাদেশের ফোকাল পার্সন ইয়াসিন আরাফাত বলেন, আমরা অবশ্যই সবুজ অর্থনীতির দিকে যাবো। কিন্তু সেটা যেন কোনো শ্রমিকের জীবিকা ধ্বংসের কারণ না হয়।
শ্রম সংস্কারেও অনুপস্থিত ইটভাটা শ্রমিক
অন্তর্বর্তীসরকার শ্রম অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছিল। কমিশনের প্রতিবেদনে ন্যায্য রূপান্তরের কথা থাকলেও ইটভাটা শ্রমিকদের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সুপারিশ নেই।
কমিশনের সাবেক সদস্য আনোয়ার হোসাইন বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রম খাত বাদ পড়ে গেছে। আশা করি বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। ইটভাটা শ্রমিকরা মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এখানে লিখিত চুক্তি নেই, বীমা নেই, সামাজিক সুরক্ষা নেই। ফলে কাজ হারালে তারা সরাসরি দারিদ্র্যের মুখে পড়ে যান।
কী হওয়া উচিত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো শিল্প বন্ধের আগে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্পটিকে পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব কি না তা যাচাই করা। দ্বিতীয়ত, যদি শিল্প বন্ধ করতেই হয়, তাহলে বিকল্প শিল্প আগে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, পুরোনো শ্রমিকদের সেই নতুন শিল্পে স্থানান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিকল্প শিল্পে যেন এখানকার শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও ঠিকাদাররা যুক্ত হতে পারে, এটি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ রক্ষা অবশ্যই জরুরি। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ হওয়া দরকার। কিন্তু সেই রূপান্তর যদি শ্রমিকদের জীবিকা ধ্বংস করে, তবে তা টেকসই হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল দর্শনই হলো পরিবেশ রক্ষার দায় যেন সবচেয়ে দুর্বল মানুষের কাঁধে একতরফাভাবে না পড়ে। ইটভাটা শ্রমিকদের জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা, পুনর্বাসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছাড়া এই রূপান্তর হবে অসম্পূর্ণ। একটি সত্যিকারের সবুজ অর্থনীতি তখনই সম্ভব, যখন তা একইসঙ্গে পরিবেশবান্ধব এবং মানুষকেন্দ্রিক হবে। ‘ন্যায্য রূপান্তর’ কেবল নীতিপত্রের ভাষা নয়। এটি হওয়া উচিত বাস্তব জীবনের নিশ্চয়তা।
নোট: প্রতিবেদনটি থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের অধীনে লেখা।