তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর সহযোগিতা বাড়াতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বেইজিংয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রী লি গুয়োয়িংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, আজকের বৈঠকে চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রী বাংলাদেশের নদীভাঙন রোধ, সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে একসাথে কাজ করার জোরালো ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া এই খাতের টেকসই উন্নয়নে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতা দিতে চীন প্রস্তুত রয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফরে দেশের স্বার্থ রক্ষা ও সমতাভিত্তিক কূটনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সফরসূচি অনুযায়ী, বিকেলে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রিমিয়ার লি কিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠক শেষে শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে ১৫টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া শুক্রবার (২৫ জুন) সকালে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও চীনের বড় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মাতা বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী কূটনীতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ-চীন অংশীদারিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই এই সফরের মূল লক্ষ্য বলে মুখপাত্র উল্লেখ করেন।
মুখপাত্র জানান, আজ চীনের স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকটি শুরু হবে। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে ১৫টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তার সংক্ষিপ্ত সফরসঙ্গীদের সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করবেন চীনা প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে সকালে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘পার্টি-টু-পার্টি’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএনপি এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
আজ চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রী লি গুয়োয়িংয়ের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ, সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। চীনা মন্ত্রী এ খাতে গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একসাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এর আগে সকালে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এবং বিডার যৌথ উদ্যোগে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম) শীর্ষক কনফারেন্সে চীনের ৮০টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সামনে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে তার সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এখন থেকে ১৫ দিনেরও কম সময়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন লাইসেন্স প্রদান করা হবে। এছাড়া চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ও মংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন এবং চীনে বাংলাদেশের প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপনের কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরটি তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে তিনি মালয়েশিয়া সফর শেষ করেন। দ্বিতীয় পর্বে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আমন্ত্রণে চীনের দালিয়ানে “অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস” সম্মেলনে অংশ নেন এবং জলবায়ু খাতে গত চার মাসে বাংলাদেশের নেওয়া উদ্যোগ তুলে ধরেন। সর্বশেষ তৃতীয় পর্বে তিনি বেইজিংয়ে আসেন। সরকারি ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীসহ মাত্র ২৫ জন সফরসঙ্গী নিয়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে তিনি এই সফর করছেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে স্মরণ করা হয়, প্রধানমন্ত্রীর পিতা ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ ও ৮০ সালের সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাতটি স্মরণীয় সফরের মাধ্যমে সেই সম্পর্ক সুদৃঢ় করেন। ২০০২ সালেও বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তারেক রহমান চীন সফর করেছিলেন। পিতা-মাতার সেই দলীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে বাংলাদেশ-চীন অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বদ্ধপরিকর বলে জানান মুখপাত্র।