নানামুখী ষড়যন্ত্রে সরকারকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা

জাতীয় গ্রিডে ১৭,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ার পর হঠাৎ সরবরাহ সংকট তৈরি করা, দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত সিদ্ধান্ত বাতিল করা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করার একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার ও অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, নিছক কারিগরি ত্রুটির আড়ালে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চক্র বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে সক্রিয় রয়েছে।

BD Conspiricy 1
ব্ল্যাকআউটের ইতিহাস ও শিক্ষা:
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়টি ঘটেছিল শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর। ওই দিন সকাল ১১টা ২৭ মিনিটে জাতীয় গ্রিডে ভারতের সাথে যুক্ত ভেড়ামারা সাব-স্টেশনের আন্তঃসংযোগ লাইনে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ত্রুটির তীব্রতায় টানা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত পুরো দেশ সম্পূর্ণ অন্ধকার ও বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়।

এই ভয়াবহ ঘটনা প্রমাণ করে, জাতীয় গ্রিড ও আন্তঃসংযোগ লাইনের হঠাৎ দুর্বলতা বা স্পর্শকাতরতাকে ব্যবহার করে পুরো দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাকে মুহূর্তের মধ্যে অচল করে দেয়া সম্ভব।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বর্তমান প্রেক্ষাপট: ২০১৪ সালের সেই বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা কাটিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখনীয় অগ্রগতি অর্জন করে। ২০২৬ সালের ২০ মে রাত ৯টায় সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৭,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়, যেখানে তৎকালীন জাতীয় চাহিদা ছিল ১৬,৮৯৭ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিডের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯,০০০ মেগাওয়াটের বেশি থাকা সত্ত্বেও এবং ১৭,২০০ মেগাওয়াট সরবরাহের সক্ষমতা প্রমাণের পর হঠাৎ এপ্রিল-আগস্টের চরম গরমের দিনে বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হওয়া এবং জনজীবন অচল হয়ে পড়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

BD Conspiricy 4
জ্বালানি চক্রান্ত ও নীতিগত আঘাত:
বর্তমান সরকারকে অবকাঠামোগত ও জ্বালানি সংকটে ফেলার জন্য পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপ লক্ষ্য করা গেছে। পূর্ববর্তী আমলে দ্রুত সরবরাহ আইনের অধীনে অনুমোদিত প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করার ফলে দীর্ঘমেয়াদী পরিচ্ছন্ন জ্বালানির যোগান মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর সামিট গ্রুপের সাথে দ্বিতীয় এফএসআরইউ (সামিটের তৃতীয় টার্মিনাল) চুক্তিটি বাতিল করে। পেট্রোবাংলার সচিব স্বাক্ষরিত নির্দেশে ২০২৪ সালের ৩০ মার্চ বিনা দরপত্রের বিশেষ আইনে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বাতিল করা হয়, যেখানে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ১৫ বছরের জন্য ১.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহের কথা ছিল। কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়।

হঠাৎ ৯০০ মেগাওয়াট সরবরাহ বন্ধ: রেকর্ড উৎপাদনের পর প্রতিবেশী দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র (যেমন আদানির গোড্ডা প্ল্যান্ট) থেকে হঠাৎ কারিগরি কারণ দেখিয়ে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা আবাসিক (৫০-৫৫%) ও শিল্প খাতে (৩০-৩৫%) তীব্র ক্ষোভ তৈরির একটি কৌশল।

BD Conspiricy 2
কূটনৈতিক বিভ্রান্তি ও মনস্তাত্ত্বিক হামলা:
অবকাঠামোগত চাপের পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে রয়টার্স এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সেই ষড়যন্ত্রমূলক জটিলতা ধরা পড়ে।

ভারতীয় গণমাধ্যম ২৩-২৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের খবর ভিত্তিহীনভাবে প্রচার করে। পরবর্তীতে ২১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ রয়টার্সকে স্পষ্ট জানান, সফরের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। উপরন্তু, দিল্লিতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান ও তাঁকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্পষ্ট জবাব পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।

দিল্লিতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা ও বিবৃতিতে যথাযথ কূটনৈতিক পরিবেশের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রেস ব্রিফিং ছাড়া হুট করে সফরের গুজব ছড়িয়ে ঢাকার ওপর দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা দৃশ্যমান।

সফরের বিভ্রান্তির পরপরই ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেয়াকে কেন্দ্র করে অপপ্রচার চালানো হয়, যেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সরকারকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে বা অপ্রগতিশীল হিসেবে তুলে ধরা যায়।

BD Conspiricy 3
চক্রান্তের সামগ্রিক রূপরেখা:
পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটি পর্যায়ক্রমিক রূপরেখা স্পষ্ট হয়, সেগুলো হলো- গ্রিডের ঐতিহাসিক স্পর্শকাতরতাকে ব্যবহার করে জাতীয় অর্থনীতি অচল করার সুযোগ তৈরি করা। গত মে মাসে ১৭,২০০ মেগাওয়াটের সক্ষমতা প্রমাণের পর কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ক্ষমতার বৈপরীত্য সৃষ্টি করা।

 ভারত সফর ও ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের ওপর মিডিয়া ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো। বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়াই সৌর প্রকল্প ও এলএনজি টার্মিনাল বাতিল করে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংকট নিশ্চিত করা। তীব্র দাবদাহের মধ্যে ৯০০ মেগাওয়াট সরবরাহ বন্ধ করে কৃত্রিম লোডশেডিং সৃষ্টি করা। সর্বশেষে, কৃত্রিম জনভোগান্তিকে হাতিয়ার বানিয়ে জনগণকে ক্ষুব্ধ করা এবং সরকারকে প্রশাসনিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল হিসেবে প্রমাণ করা।

২০১৪ সালের ১ নভেম্বরের জাতীয় গ্রিড ব্ল্যাকআউট যেমন দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রমাণ ছিল, ঠিক তেমনি ২০২৬ সালে রেকর্ড উৎপাদনের পর আকস্মিকভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ হওয়া, এলএনজি ও সৌর প্রকল্প বাতিল এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার গুজবের পর তৈরি হওয়া সংকট, সবকিছু একই সুতোয় গাঁথা। এটি নিছক কোনো কারিগরি ত্রুটি বা কূটনৈতিক স্থবিরতা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা।