জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসান ঘটিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে ‘রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির টেকসই সমাধান এবং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার নতুন আহ্বান’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিলেও এই দায়িত্ব অনির্দিষ্টকাল বহন করা সম্ভব নয়। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে।

এ সময় রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তার প্রয়োজন ক্রমেই বাড়লেও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

২০২৫ সালে যৌথ মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি চাওয়া হলেও ২০২৬ সালের আবেদন কমে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সংকটের সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইসঙ্গে বাংলাদেশকে অনির্দিষ্টকাল এই দায়িত্ব বহন করতে বলা যায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচার আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন গুরুতর অধিকার লঙ্ঘন ও নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব কারণে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। এসব গুরুতর লঙ্ঘনের জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসান এবং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার আস্থা তৈরি করতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ, তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

এ সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার ও অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের প্রশংসা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থাকে অব্যাহত সহায়তার আহ্বান জানান তিনি।

একই সঙ্গে মাদকনির্ভর অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, একটি দেশের অমীমাংসিত সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরদিন বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকুক। প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হলে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প না হয়ে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প হয়—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সেই আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।