রাজনীতির পিচ্ছিল পথে কত দ্রুত যে ক্ষমতার চূড়া থেকে পতন ঘটে, তার জলন্ত উদাহরণ হয়ে রইলেন সংরক্ষিত নারী আসন-২৩-এর সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির টিকিটে সংরক্ষিত আসনে প্রথমবার এমপি হয়ে শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশে তাকে সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হলো।
মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্রে মধ্যরাতের তাণ্ডব, ভাঙচুর এবং শত কোটি টাকার জমি দখলের চেষ্টার সাথে নাম জড়াতেই বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে মিষ্টিকে ছেঁটে ফেলার কড়া সিদ্ধান্ত নিলো বিএনপি হাইকমান্ড।
১৯৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া পেশায় ব্যবসায়ী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির রাজনীতিতে আগমন কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন তিনি, একপর্যায়ে কলেজের ছাত্র সংসদের এজিএস নির্বাচিত হন।
মূলত তাঁর রাজনীতিতে আসার মূল অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর আপন বড় ভাই, বিএনপির প্রভাবশালী প্রয়াত নেতা ও ঢাকা-৮ আসনের সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পিন্টু ২০১৫ সালে রাজশাহী কারাগারে মারা যান।
পরিবারের রাজনীতির প্রভাব এবং নিজের সাংগঠনিক দক্ষতায় মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন এবং চলতি বছরের মে মাসে জীবনের প্রথম সংসদীয় মেয়াদে এমপি হিসেবে শপথ নেন।
মিষ্টির ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবন ট্র্যাজেডিতে ভরা। তাঁর স্বামী সাইদুর রহমান নিউটন ছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহসভাপতি এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রিয় কমিশনার। ২০০২ সালের ১০ মে প্রকাশ্য দিবালোকে ধানমন্ডির অর্কিড প্লাজার সামনে আততায়ীদের গুলিতে খুন হন নিউটন। স্বামীর মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে ওই ৮ নম্বর ওয়ার্ডের উপনির্বাচনে কাউন্সিলর হিসেবে জয়লাভ করেন মিষ্টি এবং স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
রাড্ডা সেন্টারে তাণ্ডব ও ধ্বংসের গল্প: গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে একদল দুর্বৃত্ত হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। পরবর্তীতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পুরো অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়ে জমি দখলের চেষ্টা করা হয়।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২০০৪ ও ২০০৬ সালে ওয়ার্ড কমিশনার থাকাকালে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে এই জায়গাটি বরাদ্দের আবেদন করেছিলেন মিষ্টি। হামলা ও দখলাদারিত্বের পেছনে এই সমিতির নাম আসায় মিষ্টির দিকে আঙুল ওঠে।
যদিও মিষ্টি গণমাধ্যমে সোজা দাবি করেন, ২০০৬ সালের পর ওই সমিতির সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না, তবে বিএনপি প্রধান তারেক রহমান সরকার ও দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেন। আজ বৃহস্পতিবার মিষ্টিকে চূড়ান্ত পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে রাজনীতির এক বর্ণিল কিন্তু বিতর্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাল হাইকমান্ড।