মহানবমী: শুভ শক্তির জয় আর নারীশক্তির স্বীকৃতি

শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ প্রহরে এসে মহানবমী আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে আনন্দ ও বিদায়বেদনার এক গভীর মিশ্র অনুভূতি। শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা আর ঢাকের বাদ্যে যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল, নবমীতে এসে তার বিদায়বেলার করুণ সুর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আর মাত্র এক দিন পরই বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের এই সর্ববৃহৎ উৎসব। তবে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহানবমীর তাৎপর্য কেবল দেবীর বিদায় ঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত শক্তির আরাধনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং মানুষের মনের ভেতরের শুভবোধ ও বিবেককে জাগ্রত করার এক পরম উপলক্ষ।

Puja 05
পৌরাণিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের ঘটনাটি অশুভ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভ ও ন্যায়শক্তির জয়ের চিরন্তন প্রতীক। রামায়ণে রাবণের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে শ্রীরামচন্দ্রের নেয়া অকালবোধন কিংবা শাস্ত্রীয় নানা বিধিবিধানের মূল শিক্ষাই হলো, অন্যায় ও অত্যাচার যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।

এই দিনটিতে পূজামণ্ডপগুলোতে বিহিত পূজা, মন্ত্রোচ্চারণ, পুষ্পাঞ্জলি ও হোম-যজ্ঞের মাধ্যমে দেবীর কাছে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সামাজিক মঙ্গলের প্রার্থনা জানান ভক্তরা।

Puja 04
মহানবমীর অন্যতম প্রধান সামাজিক ও নৈতিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে নারীশক্তির প্রকৃত স্বীকৃতিতে। যেখানে দেবী দুর্গাকে শক্তিরূপিনী ও অসুরবিনাশিনী হিসেবে আরাধনা করা হচ্ছে, সেই সমাজেই যখন নারী নির্যাতন, যৌতুক, বাল্যবিবাহ কিংবা বৈষম্যের চিত্র ভেসে ওঠে, তখন পূজার মূল ভাবধারাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। নারীকে কেবল মণ্ডপে পূজা না করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা, শিক্ষার সুযোগ ও স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করাই হলো দুর্গাপূজার প্রকৃত বার্তা।

একইভাবে, সমাজের অশুভ শক্তি তথা দুর্নীতি, হিংসা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং ক্ষমতা ও অহংকারের যে ‘অসুর’ মানুষের মাঝে লুকিয়ে থাকে, তাকে পরাস্ত করার নামই প্রকৃত দুর্গাপূজা। অন্যায়ের সামনে নিষ্ক্রিয় না থেকে সত্য ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারাটাই নবমীর আসল দীক্ষা।

Puja 01
বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে দুর্গাপূজা মানুষকে কাছাকাছি আনে এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক নজির স্থাপন করে। শুধু উৎসবের কয়েকদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সারা বছর সংখ্যালঘু ও প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করার মাধ্যমেই এই সম্প্রীতি অর্থবহ হয়ে ওঠে।

বুধবার বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গার বিসর্জনের মাধ্যমে এই বর্ণিল উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। তবে কেবল দেবীর প্রতিমাকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া নয়; হিংসা, অহংকার ও সাম্প্রদায়িকতাকে মনের ভেতর থেকে বিসর্জন দেওয়ার অঙ্গীকারই হতে পারে মহানবমীর প্রকৃত শিক্ষা। উৎসবের প্রদীপ নেভে ও ঢাকের আওয়াজ থামে, কিন্তু মানুষের বিবেকের জাগরণ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম যেন কখনোই থমকে না যায়- এটাই মহানবমীর মূল আহ্বান।