শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন মহাঅষ্টমীতে দেবী দুর্গার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে এক কুমারী শিশুকে আরাধনা করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের মূল শক্তি, তা কুমারীর মধ্যে বীজরূপে অবস্থান করে। সেই বিশ্বাস ও আরাধনার ধারাবাহিকতায় সোমবার মহাঅষ্টমীর সকালে রাজধানীর গোপীবাগস্থ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে মহাসমারোহে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

সকাল পৌনে ১০টায় গোপীবাগে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এবার কুমারী রূপে দেবীর আসনে বসানো হয়েছিল ৬ বছর বয়সী ইর্যা চক্রবর্তীকে, যার শাস্ত্রীয় নাম দেওয়া হয় ‘উমা’। ভক্তদের উদ্দেশে কুমারীর আশীর্বাদ ছিল- ‘সবার মঙ্গল হোক’। মানবতা, নারীর সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ঈশ্বরের পরম শক্তিকে আরাধনা করাই এই পূজার মূল শিক্ষা।

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজ বলেন, পরমহংস শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের নির্দেশনায় এবং পরবর্তীতে বেলুর মঠে স্বামী বিবেকানন্দের হাত ধরে নয়টি কুমারীর পূজার মাধ্যমে যে রীতির প্রচলন ঘটেছিল, তা আজও মঠ ও মিশনগুলোতে ধরে রাখা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, স্বামী বিবেকানন্দ কেবল ব্রাহ্মণ কন্যা নয়, অব্রাহ্মণ এমনকি অহিন্দু কন্যাকেও আদ্যাশক্তি জ্ঞানে পূজা করেছিলেন, যা সমাজের বৈষম্যহীনতার এক বিরাট শিক্ষা দেয়।

এদিকে, মহাঅষ্টমীর অপর এক মহৎ পর্ব ‘সন্ধিপূজা’ সোমবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও নিষ্ঠার সাথে অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমীর শুরুর ২৪ মিনিট, এই বিশেষ ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণে ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বালন এবং মায়ের চরণে ১০৮টি পদ্মফুল ও ১০৮টি বেলপাতা নিবেদন করা হয়। প্রদীপের আলোর মাধ্যমে অন্ধকার দূর করে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা জানান ভক্তরা।

ঢাকা মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ ও পুরোহিত বরুণ চক্রবর্তী জানান, অতি অল্প সময়ের (মাত্র ৪৮ মিনিট) এই পূজার সার্বিক প্রস্তুতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিতে হয়। পদ্মফুলের অঙ্গহানি না হওয়া এবং বাতাসে প্রদীপের শিখা যেন নিভে না যায়, সেজন্য নারী ও তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের বিশেষ দায়িত্বে ভাগ করে দেওয়া হয়।
মহাঅষ্টমী ও মহানবমী উপলক্ষ্যে সাধারণ ভক্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রায় আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ ডেক মহাপ্রসাদের আয়োজন রাখা হয়েছে, যা ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা মতে, দশভুজা দেবী এবার মর্ত্যে আগমন করেছেন ‘ঘোটকে’ অর্থাৎ ঘোড়ায় চড়ে, আর বিজয়া দশমীতে কৈলাসে বিদায় নেবেন ‘নৌকায়’। শাস্ত্রের ব্যাখ্যায় ঘোড়ায় আগমন অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিলেও নৌকায় গমন ধরায় শস্য বৃদ্ধি ও সুফলা প্রকৃতির বার্তা বহন করে। আগামী বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা, যা পরবর্তীতে কোজাগরী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজার মাধ্যমে ইতি টানবে।
