সিঁদুর খেলা আর অশ্রুসজলে দেবী দুর্গাকে বিদায়

শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি, ঢাকের গুড়গুড় বাদ্য আর ধূপ-ধুনোর মিষ্টি সুবাসে চারপাশ যেন এক স্বর্গীয় আবহে মুখরিত। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল একচিলতে বিদায়ের সুর।

পাঁচ দিনের জাঁকজমকপূর্ণ শারদোৎসব শেষে অশ্রুসজল চোখে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর ক্ষণ, আজ শুভ বিজয়া দশমী। আনন্দময়ী মায়ের বিদায়বেলায় মণ্ডপে মণ্ডপে নেমে এসেছে ভক্তি, প্রেম আর বিষাদের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

Shindur Khela 04
বুধবারে বিজয়া দশমীর সকালে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, বনানীর গুলশান-বনানী পূজা মণ্ডপ, কিংবা ঐতিহাসিক রমনা কালী মন্দির, সর্বত্রই ছিল ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। সনাতন শাস্ত্রীয় রীতি মেনে সকাল থেকেই শুরু হয় দশমী বিহিত পূজা, অপরাজিতা পূজা এবং দর্পণ বিসর্জন।

দেবীর প্রতিবিম্ব দর্শনের পর ভক্তরা দেবীর পাদপদ্মে অর্পণ করেন শেষ পুষ্পাঞ্জলি, আর তাতেই সাঙ্গ হয় শাস্ত্রীয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

Shindur Khela 01
তবে বিজয়া দশমীর সবচেয়ে আবেগঘন ও বর্ণিল মুহূর্ত ছিল ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। লাল-সাদা শাড়িতে সেজে বিবাহিত নারীরা বরণের থালায় সিঁদুর, পান-সুপারি, ফুল ও মিষ্টি নিয়ে হাজির হন মণ্ডপে। পানের পাতায় দেবীর মুখ স্পর্শ করিয়ে মিষ্টিমুখ করানো এবং দেবীর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেয়া হয়।

এরপরই মণ্ডপ প্রাঙ্গণে শুরু হয় আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সিঁদুর খেলা! নারীরা একে অপরের কপালে ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে স্বামীদের দীর্ঘায়ু, সংসার সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য প্রার্থনা করেন। শুধু নারীরাই নন, অনেক স্বামীকেও দেখা গেছে স্ত্রীর কপালে সিঁদুর পরাতে, আর তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে শিশুরা মেতে উঠেছে নাচে-গানে।

Shindur Khela 06
বনানী মণ্ডপের প্রধান পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী ও চেরাগী পাহাড় মণ্ডপের পুরোহিত মানু রঞ্জন ভট্টাচার্য বিজয়ার তাৎপর্য তুলে ধরে জানান, বিজয়া দশমী মূলত অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক। সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মানব কল্যাণের প্রার্থনা নিয়েই দেবী এবার মর্ত্যলোক ছাড়ছেন। শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার মায়ের আগমন ঘটেছিল ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং কৈলাসে তাঁর গমন হচ্ছে নৌকায়।

বিদায়ের ক্ষণে মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের চোখে দেখা যায় অশ্রুর ছাপ, আবার একই সাথে ভেসে আসে এক রাশ আশার ধ্বনি। বিষাদের ঢাকের আওয়াজ ভেদ করে তরুণদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে চিরচেনা সেই প্রতিশ্রুতি- ‘আসছে বছর আবার হবে!’ ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নিচ্ছে, সমবয়সীরা কোলাকুলি করছে আর মিষ্টিমুখে বিনিময় হচ্ছে বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

Shindur Khela 03
নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সন্ধ্যার আগেই প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা পলাশী, জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর হয়ে রাজপথ প্রদক্ষিণ করে পৌঁছাবে ওয়াইজঘাটে, যেখানে বুড়িগঙ্গার জলে বিসর্জন দেওয়া হবে প্রতিমা।

চোখের জলে ধরা ধুয়ে মর্ত্যের কন্যা দুর্গা ফিরে যাবেন কৈলাসে তাঁর স্বামীর ঘরে- এই বিশ্বাস আর ভালোবাসাকে হৃদয়ে ধারণ করেই ভক্তরা অপেক্ষায় রইলেন আর একটি নতুন শরতের!