পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুরের পরাজয় কেবল এক প্রাচীন দেব-অসুরের যুদ্ধের কাহিনী নয়, বরং তা যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির এক চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক। ঢাকের আকুল বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, আরতির আলো আর কোটি ভক্তের সশ্রদ্ধ প্রার্থনায় মুখরিত শারদীয় দুর্গোৎসবের পাঁচ দিনের আনন্দ শেষে আসে বিজয়া দশমী। আজ সেই শুভ বিজয়া দশমী, মা দুর্গাকে বিদায়ের দিন।
আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে সন্তানসন্ততি নিয়ে বাপের বাড়িতে আসা দেবী দশমীতে পুনরায় ফিরে যান কৈলাসে। প্রতিমা বিসর্জনের এই ক্ষণটিতে একদিকে যেমন থাকে বিদায়ের গভীর বিষাদ, অন্যদিকে থাকে 'আসছে বছর আবার হবে' ধ্বনিতে আগামী আগমনের শুভ প্রত্যাশা। তবে এই আবেগ ও আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে উঠে বিজয়া দশমী আমাদের সামনে এনে দেয় গভীর আত্মপর্যালোচনা ও আত্মশুদ্ধির এক বড় সুযোগ।

পুরাণে দেবী দুর্গার আবির্ভাব হয়েছিল অন্যায় ও অত্যাচারী অসুরদের বিনাশ করে দেবতাদের রক্ষা করতে। কিন্তু বাস্তব সমাজে চোখ মেললে প্রশ্ন ওঠে- মণ্ডপে মণ্ডপে অসুরবধের দৃশ্য দেখে আমরা আনন্দিত হলেও, দৈনন্দিন জীবনে দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বাস্তব ‘অসুর’গুলোকে আমরা কতটুকু দমন করতে পেরেছি? সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার যখন হরণ হয় কিংবা অন্যায়ের শিকার মানুষ যখন ন্যায়বিচার পেতে হিমশিম খায়, তখন বিজয়ার মূল শিক্ষাকে কেবল আনন্দ-উৎসবের গণ্ডিতে আটকে রাখা যায় না। বিজয়ার সার্থকতা তখনই, যখন আমরা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারব।
দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান বার্তা হলো নারীর মর্যাদা ও শক্তির আরাধনা। দেবীকে আমরা 'দশভূজা' ও সর্বশক্তির রূপ হিসেবে পূজা করি। অথচ বাস্তবে আমাদের সমাজে নারীরা যখন অনাচার, অসম্মান ও অধিকারহীনতার শিকার হন, তখন দেবীবন্দনার সাথে আমাদের সামাজিক আচরণের বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নারীকে সম্মান করা, তাঁর স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং সমাজ ও পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই শক্তির এই আরাধনা পূর্ণতা পেতে পারে।
একইভাবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সর্বজনীন সামাজিক বন্ধন রক্ষা করা বিজয়া দশমীর অন্যতম বড় শিক্ষা। দুর্গোৎসবের আনন্দ হাজার বছর ধরে ধর্ম-বর্ণের সীমানা পেরিয়ে সব মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। তবে এই সম্প্রীতি কেবল উৎসবের কয়টি দিনের শুভেচ্ছা বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একে অপরের অধিকার স্বীকার করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো, এবং কোনো নাগরিক যেন তাঁর ধর্মীয় কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য বা নিরাপত্তার ঝুঁকিতে না পড়েন, তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের মূল চাওয়া।

উৎসব শেষে বিসর্জনের সময় নদী ও পরিবেশের ক্ষতি না করার দায়িত্ববোধ যেমন নাগরিক হিসেবে জরুরি, তেমনই প্রয়োজন উৎসবের শিক্ষা ধরে রাখা। বিসর্জনের সময় উচ্চারিত হয় সনাতন বৈদিক মন্ত্র-
‘গচ্ছ গচ্ছ পরম স্থানং স্বস্থানম পরমেশ্বরী।
যৎ পূজিতং ময়া দেবী পরিপূর্ণং তদস্তুমে’।
অর্থাৎ, হে দেবী পরমেশ্বরী, আপনি পরম ধামে গমন করুন এবং আমাদের পূজা যেন আপনার কৃপায় পূর্ণতা পায়।

দেবী দুর্গার মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে গমনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে সত্য, কিন্তু সমাজের অন্যায়, হিংসা, বৈষম্য ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সমাপ্তি ঘটে না। দশমীর প্রতিমা বিসর্জন হোক দেবীকে অশ্রুসিক্ত বিদায় জানানোর আচার, কিন্তু মানুষে মানুষে ভালোবাসা, নারী-পুরুষের সমতা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয় যেন কোনোভাবেই বিসর্জন না যায়, এটিই হোক বিজয়া দশমীতে আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া ও পাওয়া।
