জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর চার প্রস্তাব

চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করা এবং সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার জাপানের স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে টোকিওর ঐতিহ্যবাহী হোটেল ইম্পেরিয়ালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এই তাগিদ দেন।

সাক্ষাতের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাইকা প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় অনুষ্ঠিত ফলপ্রসূ আলোচনার কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও পরিকাঠামোগত রূপান্তরে জাইকার দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, দুই দেশের এই নিবিড় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। বৈঠকে জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত মেগা প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করা এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা নতুন অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোর প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর একমত পোষণ করা হয়।

PM Japan 03
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাপানের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা বজায় রাখা এবং টেকনিক্যাল সহায়তা বাড়ানোর গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়:

  • ‘বাংলাদেশ-জাপান স্কিলস পার্টনারশিপ’ গড়ে তোলা।
  • বিশ্বমানের একটি ‘টেকনোলজিক্যাল ভিলেজ অ্যান্ড ইনোভেশন সিটি’ (প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নগরী) প্রতিষ্ঠা করা।
  • কৃষি আধুনিকীকরণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
  • বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে গত বছরের মতো বিশেষ বাজেট সহায়তা অব্যাহত রাখা।

জবাবে জাইকা প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকো বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে জাইকার পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

PM Japan 04
জেবিসিসিইসি ও মারুবেনির সঙ্গে আলাদা বৈঠক:
জাইকা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের ঠিক আগেই বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে হোটেল ইম্পেরিয়ালে জাপান বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) সভাপতি এবং মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রসার ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে মাসুমি কাকিনোকির নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।

বৈঠকে মাসুমি কাকিনোকি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রস্তাবিত ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নত ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে জাপানি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) বাড়ানোর জোর আহ্বান জানান।

বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রী কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) আধুনিকায়ন এবং দেশে দ্বিতীয় একটি অত্যাধুনিক সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতার প্রস্তাব দেন। দেশে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে তাঁর সরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস ও আইনি সংস্কার অব্যাহত রেখেছে বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।

চার দিনের এই সফরে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের পক্ষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।