শ্যামপুরের এক ডায়িং কারখানা থেকে ৭০ ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক বুড়িগঙ্গার পানিকে দূষিত করছে। নদীর পানিতে ক্ষতিকর বস্তুকণার পরিমাণ মিলেছে আদর্শ মানের চেয়ে ২০ গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, ক্রোমিয়াম ও অ্যামোনিয়ার মতো বিষের পরিমাণও কয়েকগুণ বেশি।
গবেষকরা বলছেন, অতিরিক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি যেমন নদীর জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছে, তেমনি বাড়ছে ক্যান্সারের মতো রোগবালাই।
বুড়িগঙ্গার মুমূর্ষু দশা কাটছে না। ট্যানারি গেলেও জুটেছে নতুন উপসর্গ। দূষণের প্রভাবে রক্তিম লাল রাজধানীর প্রাণপ্রবাহের পানি। প্রতিটি ঢেউ জানান দিচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীর মৃত্যুর খবর।
এই নদীর প্রধান হন্তারক দুই তীরের অসংখ্য ডায়িং কারখানার রাসায়নিক। যার প্রভাবে নদীর পানির রঙ কালচে থেকে বেগুনি হয়ে গেছে। বাতাসে ভেসে আসে দুর্গন্ধ।
সম্প্রতি বুড়িগঙ্গা নদীর পানি নিয়ে গবেষণা চালায় ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ কনসোর্টিয়াম। এ গবেষণায় উঠে এসেছে দূষণের নিদারুণ চিত্র। মিলেছে মন খারাপের বার্তাও।
শ্যামপুর এলাকার প্রায় একশ’ ডায়িং কারখানা থেকে ৭০ ধরনের রাসায়নিক সরাসরি ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে।
যেখানে নদীতে ক্ষতিকর ভাসমান বস্তুকণা থাকার কথা ১০, সেখানে পাওয়া গেছে ১৯৫। এই বস্তুকণা পানির নিচে আস্তরণ তৈরি করে জলজ উদ্ভিদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আরও পড়ুন: এখনো তিন কোটি বই পৌঁছায়নি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে
আর শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে দ্রবীভূত অক্সিজেন। ফলাফল জলজপ্রাণী শূণ্য হচ্ছে বুড়িগঙ্গা। কোন ধরনের মাছের পক্ষে সম্ভব এই পানিতে বেঁচে থাকা।
বুড়িগঙ্গায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফেনলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পানিতে প্রাক-বর্ষা মৌসুম, বর্ষা ও অন্য সময়ে এর যে পরিমাণ পাওয়া গেছে তা আদর্শমানের থেকে অনেক বেশি।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণায় ফল উপস্থাপন করে পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীর শ্যামপুর অংশের পানি দূষণ সবচেয়ে বেশি।
তিনি জানান, শ্যামপুরের পানিতে বিষাক্ত অ্যামোনিয়ার উপস্থিতি আদর্শমানের চেয়ে বহুমাত্রায় বেশি। যা পানিতে নাইট্রোজেন দূষণকে নির্দেশ করছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত নাইট্রোজেন নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য দূষণীয়। শ্যামপুরের পানিতে অতিরিক্ত মাত্রায় তেল ও গ্রিজও পাওয়া গেছে।
এই পরিবেশবিদ জানান, ডায়িং কারখানার রাসায়নিক সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও তা মানছে না কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান।
দূষণরোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা অনুপস্থিত। রাসায়নিক পরিশোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেই। বিষফোঁড়া হিসেবে আছে নৌযানের দূষণ।
শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, উজান থেকে ভাটিতে গিয়ে শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর পানিও দূষিত হচ্ছে। বাড়ছে ক্যান্সার, কিডনি ব্যাধির মত জটিল রোগবালাই। মাছশূন্য হচ্ছে নদী।
রাসায়নিক বর্জ্যের হাত থেকে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে পরিশোধনাগার নির্মাণের বিকল্প নেই বলেও জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।
একাত্তর/এসজে