বগুড়া-৩ আসনের নির্বাচনী চিত্র

যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আছে বিস্তর অভিযোগ

উন্নয়ন বঞ্চনাই প্রধান আলোচনা বগুড়ার দুপচাঁচিয়া এবং আদমদীঘি উপজেলা জুড়ে। ভোটারদের অভিযোগ, দিনের পর এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা বদল হয়নি। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এখনও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবার প্রধান অবলম্বন। অথচ পরপর দুই বারের নির্বাচিত এমপিকে তারা কখনও কাছে পাননা। এনিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারাও জানান, বারবার শরিকদের আসন ছেড়ে দেয়ায় তাদেরও উন্নয়নের জন্যে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যের ওপর ভর করতে হয়। 

সান্তাহার রেল জংশন। রেল চললেই এখানে বেড়ে যায় যানজটের ভোগান্তি। শহরের ভেতরে আন্তঃজেলা টার্মিনাল সেই যানজটকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। যানজট কমাতে রেল লাইনের ওপর একটু ওভারপাস হবার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। দশ বছর সংসদে থেকেও সমস্যাটির সমাধান করতে পারেননি জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য। যা নিয়ে ক্ষোভ আছে মানুষের মনে। 

আদমদীঘির পৌরসভা সড়ক। বেশকিছু অংশে এখনও ইটের রাস্তা। কাঁচা-পাকা এমন অনেক সড়কই আছে এখানে। স্বাস্থ্যখাতেও খুব বেশি উন্নয়ন হয়নি এই আসনে। যে কোন বড় সমস্যায় ছুটতে হয় শহরে। দু'বার ক্ষমতায় থেকেও সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেননি জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য। 

বরাবরই আসনটি দখলে ছিলো বিএনপির। ১৯৯১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত নির্বাচনে বিএনপিরই জয়ী হবার ইতিহাস। তাই জোটের প্রার্থীকে আসন ছেড়েছিলো আওয়ামী লীগ। কিন্তু এবার এ আসনে লড়াইয়ে নামতে চান নৌকার প্রার্থীরা। মনোনয়ন দৌড়ে আছেন ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন। 

বিএনপি জামায়াত অধ্যুষিত এই আসনে আওয়ামী লীগ নিজেদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রয়াত আনছার আলী মৃধা শুরুতে যেভাবে মাঠ তৈরি করেছিলেন সেই শিকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ মাঠ তৈরি করছে। তবে এই মাঠে সিরাজুল ইসলাম রাজুর সঙ্গে আওয়ামী লীগেরই আরও ক’জন প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠে নেমেছেন।

এদিকে, বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বগুড়া-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল মজিদ তালুকদার ১৯৭৯, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন। আব্দুল মজিদের মৃত্যুর পর তার ছেলে আব্দুল মোমেন তালুকদার খোকা ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী মামলায় মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত হন তিনি।

আব্দুল মোমেন তালুকদার খোকার অবর্তমানে তার ছোট ভাই আদমদীঘি উপজেলা বিএনপি সভাপতি ও আদমদীঘি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মহিত তালুকদার আলোচনায় রয়েছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে প্রথমে আব্দুল মহিত তালুকদারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে তার পরিবর্তে মনোনয়ন দেওয়া হয় তার ভাবি মাছুদা মোমেনকে। তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম তালুকদারের কাছে। তিনি এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আব্দুল মহিত তালুকদারের পাশাপাশি মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে আরও পাঁচজনের নাম শোনা যাচ্ছে। তারা হলেন- বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফজলুল বারী তালুকদার বেলাল, সান্তাহার পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ফিরোজ কামরুল হাসান, বগুড়া শহর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক হিরু, আদমদীঘি উপজেলা সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফি আহম্মেদ আচ্চু এবং সান্তাহার পৌরসভার বর্তমান মেয়র ও সান্তাহার পৌর বিএনপির বর্তমান সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টু।

অন্যদিকে, জাতীয় পার্টি আছে নানা টানাপোড়েনে। জোটগতভাবে নির্বাচনের কারনে এই আসনটি ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। এ দুই নির্বাচনে এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নুরুল ইসলাম তালুকদার। জাতীয় পার্টি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনশ’ আসনে প্রার্থী দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সে হিসাবে বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম তালুকদার আগামী নির্বাচনে এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী।

আর জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান কি হবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের প্রকাশ্য কর্মকান্ড নেই। তবে জানা গেছে, চেইন অব কমান্ড মেনে চলা ক্যাডার ভিত্তিক দলটি ভিতরে সাংগঠনিক কাজ শুরু করেছেন অনেক আগে। এই আসনে এখনো দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশী প্যানেলে রয়েছে তিনজনের নাম। 

ভোটাররা বলছেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে যাকে সবসময় এলাকায় পাওয়া যাবে তাকেই নির্বাচিত করবেন তারা। ১৯৭৩ সালের পর এই আসনে কখনও স্থায়ী কোন আওয়ামী লীগ নেতাকে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। এ কারণেই বারবার আসনটি তাদের হাতছাড়া হচ্ছে, বলছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। 

একাত্তর/এআর