গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধিতার অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অধিকারভিত্তিক উপস্থাপনের আহবান

গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপস্থাপন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবাধিকারভিত্তিক এবং মানববৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে করার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, সম্পাদক ও উন্নয়নকর্মীরা।

সোমবার (২৪ নভেম্বর) রাজধানীর জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত এক সংলাপে তারা বলেন, গণমাধ্যম যদি প্রতিবন্ধিতাকে ‘দয়ার পাত্র’ বা ‘সমস্যা’ হিসেবে নয়, বরং অধিকার ও বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরে, তবেই সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের সহযোগিতায় এবং উন্নয়ন সংস্থা ‘সমষ্টি’ আয়োজিত “গণমাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধিতার অন্তর্ভুক্তি: সম্পাদকীয় নীতি ও চর্চা” শীর্ষক এ সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ড. সুজান ভাইজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মুহম্মদ হিরুজ্জামান এনডিসি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ।

ড. সুজান ভাইজ বলেন, গণমাধ্যমের হাতে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা আছে। প্রতিবন্ধিতাকে মানববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখাতে হবে। সংবাদ তৈরি ও নীতি প্রণয়নের প্রতিটি স্তরে অন্তর্ভুক্তির দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করতে হবে।

জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মুহম্মদ হিরুজ্জামান জোর দিয়ে বলেন, গণমাধ্যমকে কেবল প্রতিবেদনেই নয়, নিজেদের প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরেও অন্তর্ভুক্তিমূলক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মক্ষেত্রে সুযোগ করে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

সঞ্চালক রিয়াজ আহমদ বলেন, অন্তর্ভুক্তি শুধু প্রতিবন্ধিতার বিষয় নয়, এটা সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিবন্ধী অধিকারের বিষয়টি কতটা প্রাধান্য পাচ্ছে, সেটি গণমাধ্যমকে নজরে রাখতে হবে এবং তাদের দায়বদ্ধ করতে হবে।

প্যানেল আলোচকদের মধ্যে সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী বলেন, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনো সীমাবদ্ধতা আছে। প্রতিবন্ধিতাকে এখনো মানবাধিকারের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয় না। তবে সংবেদনশীলতার সূচনা হয়েছে। এখন সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটাকে সফল পরিণতি দিতে হবে।

সাইট সেভার্সের অয়ন দেবনাথ জানান, দেশে প্রায় দুই কোটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন। তাদের চ্যালেঞ্জ ও অধিকারের বিষয়গুলো যেন নীতি-নির্ধারকদের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ফারজানা রেজা স্মরণ করিয়ে দেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কিছু করা দাতব্য নয়, এটা তাদের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং নিজস্ব আইনও করেছে। এখন গণমাধ্যমসহ সব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বকে এ ব্যাপারে সংবেদনশীল হতে হবে।

সংলাপে আরও আলোচনা হয় গণমাধ্যমের বিষয়বস্তুকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্য করা, সঠিক ও সম্মানজনক ভাষা ব্যবহার এবং সফল উদাহরণগুলো বেশি করে তুলে ধরার ওপর।

অনুষ্ঠানে ‘প্রতিবন্ধী সমতা’ কার্যক্রমের আওতায় মিডিয়া ফেলোশিপপ্রাপ্ত সাত সাংবাদিককে সম্মাননা ও সনদ দেওয়া হয়। তারা হলেন:

  • আসাদুর রহমান (রেডিও পদ্মা)
  • কাউসার সোহেলী (মাছরাঙা টিভি)
  • মো. মঞ্জুরুল ইসলাম (প্রথম আলো)
  • নাওয়াজ ফারহিন অন্তরা (ঢাকা ট্রিবিউন)
  • নীলিমা জাহান (ডেইলি স্টার)
  • রীতা ভৌমিক (উইমেন আই২৪.কম)
  • মেন্টর হিসেবে বিশেষ সম্মাননা পান একাত্তর টিভির শাহনাজ শারমীন।

সংলাপ শেষে অংশগ্রহণকারীরা একবাক্যে স্বীকার করেন, গণমাধ্যম এখন আর শুধু প্রতিবেদক নয়, পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। প্রতিবন্ধিতার প্রতি সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা এখন গণমাধ্যমের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব উভয়ই।