'ভুক্তভোগীর সুরক্ষা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দুটোই থাক'

নৈতিকতায় শক্ত থেকে ভুক্তভোগীর সুরক্ষা যেমন দিতে হবে তেমনি মত প্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে হবে বলে একটি আলোচনায় সভায় মত দিয়েছেন একজন বক্তা। 

সোমবার রাতে একাত্তর টেলিভিশনের নিয়মিত আয়োজন নূর সাফা জুলহাজের সঞ্চালনায় একাত্তর মঞ্চ-এ মন্তব্য করেন সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ এ. আরাফাত। 

গণতন্ত্র না স্বাধীনতা? অনুষ্ঠানের শুরুতেই এ প্রশ্ন তুলে সঞ্চালক নূর সাফা জুলহাজ বলেন, বলা হয় ভিন্নমতই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবে। কিন্তু ভিন্নমত আর গণতন্ত্রবিরোধী মত কি এক? যেমন রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, সাম্প্রদায়িক কিংবা নারী বিদ্বেষী মত কি ভিন্নমত? নাকি গণতন্ত্রবিরোধী মত?

’আবার আইনে কিংবা আচরণে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে অস্বীকার কিংবা চাপ তৈরি কি গণতান্ত্রিক ধারণা? অন্যদিকে দায়িত্বশীলতা ছাড়া কি স্বাধীনতা হয়? আমরা দেখছি আমাদের সমাজে যেখানে, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আদর্শ প্রশ্নেও বিরোধ, বিভক্তি রয়েছে। সেখানে সকল কিছুই যেন দলীয় অবস্থান থেকে দেখা হয়। 

উপস্থাপক প্রশ্ন তোলেন, ‘এখানে নিরপেক্ষতা কি দুরাশা? আবার নিরপেক্ষতা মানে কি মুক্তিযুদ্ধ, সত্য বা ন্যায়ের প্রশ্নেও নিরপেক্ষ?  রাজনৈতিক দল, করপোরেশন, ক্ষমতা, সরকার বা সরকারগুলো এইসব প্রশ্নগুলোকে কীভাবে দেখে?

‘তারা কি আসলে সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন দেখতে চায়? ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ মোকাবিলায় আরেকটি ভুল বা সাংবাদিককে তুলে নেয়া বা গ্রেফতারের ঘটনা কি গ্রহণযোগ্য? গণমাধ্যমে ভুল যারা দেখছেন তারা কি বিতর্কিত ডিজিটাল আইনে মামলার বিষয়গুলো নজরে আনছেন?

রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন ক্ষমতা নিয়ে কাজ, তেমনি সংবাদের কাজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার স্বাধীন পরিবেশ কতটা তৈরি হচ্ছে?

প্রশ্ন করা নিয়ে যদি কোনও সমস্যা তৈরি হয় তা সমাধানের জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে কিনা? গণমাধ্যম ছাড়া কি গণতন্ত্র হয়?

ভূমিকার পর সঞ্চালক প্রশ্ন করেন, প্রথম আলোর সংবাদটি নিয়মসিদ্ধ হয় নি। তারা সেটা সরিয়ে নিয়েছেন। এজেন্ডা আছে এই ধরণের সংবাদের, ইনটেনশন আছে বলে অভিযোগ। সাংবাদিক শামসুজ্জামানকে যেভাবে তুলে নেয়া হল, পরবর্তীতে গ্রেফতার দেখানো হল- এই ঘটনাগুলোকে সাংবাদিকদের ওপর সরকারের চাপ তৈরির ইনটেনশন মনে করেন কিনা? ভুল সংবাদ যদি ইনটেনশন হয় তাহলে এটাও কি সাংবাদিকতার ওপর চাপ তৈরির ইনটেনশন নয়?

আরও পড়ুন: উৎপাদনে ভরপুর, তবে বাজারে হিমশিম কেন?

জবাবে মোহাম্মদ এ আরাফাত বলেন, ১৯৭৪ সালে বাসন্তীর গল্প আপনারা জানেন। সেটা কি সাংবাদিকতা ছিল? না ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ছিল? যদি কোনও ক্রাইম হয় তাহলে তার ওপর আইনের প্রয়োগ হবে কিনা?

’বাসন্তির গল্প অপরাধ হলে সবুজের গল্পটিও অপরাধ। এছাড়া শিশুর অপব্যবহার থেকে শুরু করে যত ধরনের জালিয়াতি সবই করা হয়েছে। অপরাধ যদি সংগঠিত হয়ে থাকে তাহলে সেখানে আইনের প্রয়োগ হতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সিআইডি যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কিন্তু বলা হচ্ছে, তুলে নেয়া হয়েছে। ছেড়ে দেয়া হয়েছে। 

একই প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান বলেন, ‘এটা মোটেও আইনসম্মত ভাবে হয় নি। ১৭ মিনিটের মাথায় সংবাদ উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। সংশোধনী দেয়া হয়েছে। মামলা করার মতো কোনো বিষয়ই এখানে নেই।’ 

এসময় সঞ্চালক নূর সাফা জুলহাজ মোহাম্মদ এ আরাফাতকে প্রশ্ন করেন, ’বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে এই ঘটনা ঘটলে আপনি তখন কী বলতেন?’

মোহাম্মদ এ আরাফাত বলেন, ‘বিএনপি আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কাজ করেছে। তারা ক্ষমতায় থাকার সময় অধ্যাপক মুনতাসির মামুন, শাহরিয়ার কবীর, সেলিম সামাদসহ অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিক ও লেখকদেরকে কোমরে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হতো। এখানে তো সেটা ঘটছে না। দ্রব্যমূল্য বেড়েছে এটা নিয়ে টকশোতে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে, নিউজ হচ্ছে। 

’কিন্তু একটা অফেন্স ঘটে গেছে এবং এটা প্রমাণিত। একটা শিশুকে আপনি এভাবে ব্যবহার করতে পারেন? ওই ব্যক্তি যে রিপোর্ট করেছে এটা প্রমাণ করার কিছু নাই। অতীতে বাসন্তীর ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি।’ 

আরাফাত বলেন, যুক্তরাজ্যে প্রত্যেক মাসে ৯ জন করে ডিজিটাল অপরাধী গ্রেফতার হয়ে জেলে যায়।  যুক্তরাষ্ট্রে গত তিন মাসে ৩১২ জন সাংবাদিক গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছেন। 

সঞ্চালক প্রশ্ন করেন, ‘অনেকেই বলছেন এই সংবাদটি নিয়মসিদ্ধ হয় নি। বঙ্গবন্ধুও বলেছিলেন যে, স্বাধীনতা তখনই মিনিংফুল হয় যখন মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়। যদি কেউ এ বিষয়ে কথা বলে তাহলে কি সাংবাদিকতা করা যাবে না তা নিয়ে।’

মোহাম্মদ এ আরাফাত বলেন, ‘অবশ্যই করা যাবে। প্রতিদিনই তো রিপোর্ট হচ্ছে। ডেইলি স্টারেও রিপোর্ট হচ্ছে। কিন্তু ডেইলি স্টারের সেই সাংবাদিককে কি গ্রেফতার করা হয়েছে? মামলা করা হয়েছে? হয় নি তো। 

’বাসন্তীকে যে শাড়ি খুলে জাল পড়িয়ে ছবি তোলা হয়েছিল, এটা কি সাংবাদিকতা নাকি চক্রান্ত বা অপরাধ। একটা সাত বছরের বাচ্চাকে আপনি ফুঁসলিয়ে টাকা দিয়ে ছবি তুললেন। তার বাবা মার অনুমতি নিলো না। তার যে ছবি দিলেন, সেই ছবির যে রিপারকেশন- তার আশেপাশে, স্কুলে তার কী হতে পারে, এগুলো আপনি অ্যাড্রেস করেছেন? এই যে ভায়োলেশন, এটা সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তারা একটা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই কাজটি করেছে।’ 

আহমেদ আজম খান বলেন, যে প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার করা হয়েছে সেটা বেআইনি। তাকে যে ছেড়ে দেয়া হয়েছে সেটা পরিবারের কাছে দেয়া হয় নি। 

সঞ্চালক প্রশ্ন করেন, আমাদের এখানে ক্ষমতা সাংবাদিকতার ওপর চাপ তৈরি করে কিনা? বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ- দুই আমলেই অবস্থাটা কেমন?

মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, কিছুটা হলেও থাকে কিন্তু। এটা সব দেশেই থাকে। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া করেছে। বাংলাদেশেও বিএনপির আমলে ৫৭ ধারা ছিল। আওয়ামী লীগের আমলে আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে না। বিএনপি উঠতে বসতে আইনের অপপ্রয়োগ করেছে। 

এসময় আহমেদ আজম খান শুধু আওয়ামী লীগের সময়ের সমালোচনা করে কথা বলেন। বিএনপির সময়ের বিষয়ে তার হোম ওয়ার্ক নেই বলে এড়িয়ে যান। 

প্রশ্ন করা হয় ’বিতর্ক ব্যবস্থাপনা বা ‘ডিসপিউট ম্যানেজমেন্ট’ নিয়ে। একটা সংবাদ নিয়ে মতামত তৈরি হয়েছে যে, এটা ঠিক হয়নি, সাংবাদিকতার নিয়মসিদ্ধ হয়নি। এখন এই বিতর্ক ব্যবস্থাপনায় যে পদ্ধতি নেয়া হলো তাতে সংবাদটা যতটা ক্ষতি করতো তার চেয়ে বেশি ভাবমূর্তির ক্ষতি করলো কিনা? 

মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, আমি মনে করি না। ভাবমূর্তির বেশি ক্ষতি নাই। যেখানে রাইট অ্যাকশন নিতে হবে। রাজনীতিকদের মধ্যে কেউ অন্যায় করলে অন্যায় করলে অ্যাকশন নিতে হবে। সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ অনায় করলে অ্যাকশন নিতে হবে। যেকোনও পেশায় এটা হতে হবে। নৈতিক জায়গায় আপনাকে শক্ত থাকতে হবে। একইসাথে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকতে হবে। 

সঞ্চালক প্রশ্ন করেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা হয়েছে ২১০টি, যাতে গ্রেফতার হয়েছেন ৫৪ জন সাংবাদিক। কিন্তু ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট যে কারণে করা হয়েছিল – নারী বিদ্বেষ, ধর্মীয় বয়ান দিয়ে উস্কানি ঠেকানো। সেখানে কোথাও আমরা কিন্তু আজ পর্যন্ত দেখিনি এই আইনের প্রয়োগ হতে। 

মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, না হয়েছে। এই আইন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে নারীরা। আমার কথা আমরা মিলেমিশে না ফেলি। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর অপরাধ, অপরাধে বিপক্ষে যে আইনের প্রয়োগ- এই দুটো যেন আমরা মিলেমিশে না ফেলি। আমার কথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য আমাদের দাঁড়াতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকতে হবে। এই অবস্থার মধ্যে যারা অপরাধ করবে তাদের থেকে যেন ভিকটিমরা যেন প্রটেকশন পায়। 


একাত্তর/আরবি