আসন ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত ছাড়াই ১৪ দলের বৈঠক

শরিকদের মধ্যে আসন ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে ১৪ দলের বৈঠক। প্রায় পৌনে চার ঘণ্টার এই বৈঠক রাত ১০টার দিকে শেষ হয়। সোমবার সন্ধ্যায় ১৪ দলের প্রধান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন শরিক দলগুলোর নেতারা।

বৈঠক শেষে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন একাত্তরকে জানান, জোটের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরর ওপর আসন ভাগাভাগির ভার দেওয়া হয়েছে। আগামী দিনের দুই মধ্যে তারা বিষয়টি চূড়ান্ত করবেন।

জোটের আরেক শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল ইনু একাত্তরকে বলেন, জোটপ্রধান শেখ হাসিনা শরিক দলগুলোকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

বৈঠক চলাকালীন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া জানান, মঙ্গলবার দুপুরে এই বৈঠক নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। ভোট হবে ৭ জানুয়ারি। আর এরই মধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা শেষ হয়েছে। বাছাইও শেষ হয়েছে বিকেলে।

১৪ দলের বৈঠক শেষে নেতারা জানান, জোটের দলগুলোর সঙ্গে আলাদা আলাদা করে বৈঠক করবেন ওবায়দুল কাদের, আমির হোসেন আমু, বাহাউদ্দিন নাছিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক। এদিকে তরিকত ফেডারেশনে নেতা নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী জানিয়েছেন, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী জোটের চার শরিকদলের প্রধানের আসন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি করে ভোটে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। জোটের অন্যান্য দলের সিংহভাগ প্রার্থীই আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেন।

এবারের ভোটেও নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটগতভাবে ভোট করার কথা জানিয়ে ১৪ দলের ছয়টি দল নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে।

তফসিল ঘোষণার পর মাত্র দুটি আসন ছেড়ে ২৯৮ আসনেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এই দুই আসন হলো জাসদের হাসানুল হক ইনুর কুষ্টিয়া-২ ও জাতীয় পার্টির সেলিম ওসমানের নারায়ণগঞ্জ-৫।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ভিত্তিতে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৪ দলীয় জোট।

মূলত ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই বছরই ২৩ দফা ঘোষণা দিয়ে ১৪ দলীয় জোটের যাত্রা শুরু হয়।

আওয়ামী লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও ১১ দল মিলে জোট গঠিত হয়। কিন্তু জোট গঠনের পর পরই ১১ দল ভেঙে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদসহ কয়েকটি দল বেরিয়ে যায়। রয়ে যায় ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণফোরামসহ কয়েকটি দল। তারপরও জোটটি ১৪ দল নামেই পরিচিত।

pm

২০০৮ সাল থেকেই ১৪ দল ও আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে আসছে। তিনটি জাতীয় নির্বাচনের দুটিতে জোটের শরিক হিসেবে ছিল জাতীয় পার্টিও। তবে ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের বর্জনের পর জাতীয় পার্টি জোটে ছিল না। এবারও বিএনপি ভোটে নেই। জোটে নেই জাতীয় পর্টি।

২০১৪ সালে জোট না থাকলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থী আছে, এমন ৩৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। এসব আসনেই জয় পায় দলটি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের জোট করার পর তাদেরকে দেওয়া হয় ২৬টি আসন, এর মধ্যে তারা জয় পায় ২৩টিতে। এবার অবশ্য দলটিকে কোথাও ছাড় দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি।

গত নির্বাচনে ১৪ দলের শরিকদেরকে ১৬টি আসনে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে ১৪টিতে প্রার্থীরা ভোট করে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কায়, জাতীয় পার্টি (জেপি) দুইজন প্রার্থী তাদের দলীয় প্রতীক বাইসাইকেল নিয়ে ভোটে অংশ নেয়।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫টি আসন পায় ওয়ার্কার্স পার্টি। আসগুলো ছিল ঢাকা-৮, রাজশাহী-২, বরিশাল-৩, ঠাকুরগাঁও-৩ ও সাতক্ষীরা-১। এর মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী ও সাতক্ষীরায় জয় পায় দলটি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ পায় তিনটি আসন। এগুলো হলো কুষ্টিয়া-২, ফেনী-১ ও বগুড়া-৪। দলটির দুই নেতা জয় পায় কুষ্টিয়া ও ফেনীতে।

বিকল্পধারাকে দেওয়া হয় মুন্সীগঞ্জ-১ ও লক্ষ্মীপুর-৪ ও মৌলভীবাজার-২ আসন। তাদের প্রার্থীরা জয় পান মুন্সীগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুরে। তরীকত ফেডারেশন পায় লক্ষ্মীপুর-১ ও চট্টগ্রাম-২ আসন। দলটির প্রার্থী জয় পান চট্টগ্রামে।

জাতীয় পার্টি (জেপি) পায় কুড়িগ্রাম-৪ ও পিরোজপুর-২ আসন। এর মধ্যে পিরোজপুরে জয় পায় পিরোজপুরে।

বাংলাদেশ জাসদ পায় চট্টগ্রাম-৮ আসন। সেই আসনে বিজয়ী প্রার্থী মইন উদ্দীন খান বাদল ২০২০ সালে মারা গেলে আওয়ামী লীগের নেতা মোসলেম উদ্দিন আহমেদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

তারও মৃত্যু হয় ২০২৩ সালে। গত ২৭ এপ্রিল আবার উপনির্বাচন হলে জয় পান আওয়ামী লীগের নোমান আল মাহমুদ।

এই আসনগুলোর বাইরে আরও অনেকগুলোতে এসব দলের একক প্রার্থী ছিল।

এবার দুটি আসন ছেড়ে ২৯৮ আসনেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে তারা জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে যাবে, এ কথা নির্বাচন কমিশনে লিখিতভাবে জানিয়েছে। একইভাবে ১৪ দলের শরিক দলগুলোও আলাদাভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে।

তফসিল অনুযায়ী, যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর। জোটের শরিকদের আসন ছাড় দিলে ওই দিনের আগেই নৌকার প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিতে।

প্রতীক বরাদ্দ হবে ১৮ ডিসেম্বর। আর ওই দিন থেকেই প্রার্থীরা প্রচার শুরু করতে পারবেন।