চিলের পিছে না ছুটে কান আছে কিনা দেখতে হবে: অর্থমন্ত্রী

কোন দেশ কী নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে সেদিকে না তাকিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নাগরিক ও বিজয়ী জাতি হিসেবে দেশ গঠনে সবার এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন।

আর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কোনো চাপ অনুভব করছেন না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে একাত্তরকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। 

নির্বাচনের পরে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে কিনা, নিজের আসনে জাতীয় পার্টির অবস্থান, নারীদের রাজনীতিতে আসা, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।  

এবারের ভোটেও সিলেট-১ আসন থেকে নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আব্দুল মোমেন। এই আসনকে ভিআইপি আসন বলা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে যে দলের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে, সে দলই সরকার গঠন করেছে।

বিখ্যাত সুফি দরবেশ ও ধর্ম প্রচারক হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের মাজার এলাকা গঠিত এ আসনে দীর্ঘদিন সংসদ সদস্য ছিলেন সাবেক স্পিকার ও দুই দুই অর্থমন্ত্রী। এরা হলেন সাবেক স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও সাইফুর রহমান।

আবুল মাল আবদুল মুহিতের পর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সিলেট-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন একে আবুল মোমেন। এরপর তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলে আসছেন।

৭৭ বছর বয়সী একে আব্দুল মোমেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ এবং উন্নয়ন অর্থনীতিতে এমএ করেছেন। এরপর হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে করেছেন এমবিএ। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রিও রয়েছে তার।

একে আব্দুল মোমেনের রয়েছে বর্ণময় কর্মজীবন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দুই মন্ত্রণালয়ের দুই মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। এরপর চলে যান শিক্ষকতায়।

মেরিম্যাক কলেজ, সালেম স্টেট কলেজ, নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়, এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অফ গভর্নমেন্ট এ অর্থনীতি ও ব্যবসায় প্রশাসন পড়িয়েছেন।

২০০৯ সালের আগস্ট মাসে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি নিযুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেছেন।

একাত্তর: নির্বাচনের পরে কোনো নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে কিনা?

একে আব্দুল মোমেন: ভিসা নীতির বিষয়ে আমি জানি না। আমেরিকা চাইলে তাদের ভিসা না দিতেই পারে। আমেরিকার ভিসাতো সহজে দেয়ও না। অনেক টাকা খরচ করে কয়েক হাজার আবেদন করে, সবাইতো পায় না। ছাত্রছাত্রীরা কিছুটা পায়। আমার যারা নেতাকর্মী, মাঠে ঘাটে কাজ করে, তারাতো ভিসার আবেদনও করে না।

সুতরাং এটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ নিয়ে আমরা কোনো দিন কোনো চাপও অনুভব করিনি। তবে হ্যাঁ, আমাদের দেশের অনেক লোক আছেন; সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মী, সুশীল সমাজের নেতাসহ অনেকে, তাদের ছেলে-মেয়েরা অনেকে বিদেশে পড়াশোনা করে, তারা কেউ কেউ সেখানে বাড়িঘরও করেছেন। তাদের মধ্যে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল যে, তাদের সে বাড়িঘর রক্ষা করতে পারবো কিনা।

স্যাংশন হলে বাড়িঘর ও অ্যাকাউন্ট নিয়ে সমস্যা হবে কিনা! তাদের মধ্যে ভয়। তবে আমাদের মধ্যে কোনো ভয় নেই। আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে এটার কোনো প্রভাব নেই।  

একাত্তর: স্বাধীন সার্বভৌম দেশে এরকম হস্তক্ষেপ কেনো?

একে আব্দুল মোমেন: কোনো কোনো দেশ শক্তিশালী, পরাশক্তি। তাদের সব... এটা তো আমরা বলতে পারি না। আমাদের মতো দরিদ্র দেশ, আমাদের এতো শক্তি নাই, এতো ক্ষমতা নাই। আমরা চাই, বিশ্বে শান্তি থাকুক, সব লোক নিজের মতো সুখে শান্তিতে থাকুক। আমরা বিশ্ব শান্তি চাই। অন্যের উপকার হচ্ছে, এটা আটকাতে হবে, আমাদের এই মানসিকতা নেই।

অনেক লোক আছে, আপনি ভালো করতেছেন, একটা না একটা অজুহাত তুলে আপনাকে ঠেকাবে। কতগুলো রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে গেছে, মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে। ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানসহ অনেক দেশের ওপর নানা অভিযোগ দিয়েছে, পরে আর কিছুই পায়নি। এমন অনেক ভাঁওতাবাজি আমরা অনেক শুনেছি, জেনেছি।

মূল বিষয় হলো- জনগণের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এখন আমরা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমরা বিজয়ী জাতি। আমাদের কান চিলে নিয়ে গেছে, এটা শোনার পর হাত দিয়ে দেখা উচিত- আসলে কান আছে কিনা। তারপরও এই সম্পর্কে বক্তব্য দেওয়া উচিত। আমরা কোনো ধরনের চাপ অনুভব করি না। যা হবে, ওপরওয়ালা আছেন, দেশের জনগণ আছে, আর শেখ হাসিনা আছে।

একাত্তর: জাতীয় পার্টি আপনাকে সাপোর্ট দিয়েছে, এটি কি আসলে মহাজোট করার ইঙ্গিত?

একে আব্দুল মোমেন: না, এতে আমি খুবই আনন্দিত। সিলেটে একটা ঐতিহ্য আছে, সম্মানবোধ আছে, শ্রদ্ধাবোধ আছে। আমি জানতাম না, শুনেছিলাম- জাতীয় পার্টির বাবুল সাহেব নির্বাচন করবেন না। উনি অনেক টাকার মালিক। গত সিটি নির্বাচনে উনি ভোট করেছেন, ৫০/৬০ হাজার ভোট পেয়েছেন। এই অঙ্ক কিন্তু কম নয়।

উনি সিটিতে ভালো করায়, তাকে দল থেকে সিলেট-১ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু তিনি একজন বড় মনের মানুষ। তিনি বলেছেন, সিলেট-১ আসনে নৌকার প্রার্থী আব্দুল মোমেন সাহেব এবং উনার পরিবারকে আমি শ্রদ্ধা করি। এই পরিবারের কোনো সদস্যদের বিরুদ্ধে আমি নির্বাচন করবো না। এটা সিলেটের ঐতিহ্য। আমরা একে অপরকে সম্মান করি ও সহযোগিতা করি।

momen

একাত্তর: আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার কী প্রাধান্য থাকবে?

একে আব্দুল মোমেন: ২০০৮ সালে আমাদের ইশতেহারে এমডিজির সবগুলো লক্ষ্যকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। যাতে এই লক্ষ্য অর্জনে দেশের মানুষের উপকার হয় এবং বিশ্ববাসী আমাদের সহায়তা করে। আর এখন আমরা অঙ্গীকার করেছি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করবো। যেমন- ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ।

আমরা আশা করি, ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ ঘোষণা করতে পারবো। যদি ৫ শতাংশের কম অতিদরিদ্র থাকে, তাহলে এটাকে দারিদ্রমুক্ত বলা যায়। আমরা ইতিমধ্যে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আছি। ইনশাআল্লাহ আমরা দারিদ্রমুক্ত করতে পারবো।

দারিদ্র একটা অভিশাপ, শুধু এটা আমাদের বড় কাজ। আমরা সুপেয় পানি, শতভাগ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বিভিন্ন অবকাঠামো, পরিবেশ বান্ধব উন্নত শহরসহ টেকসই উন্নয়ন লক্ষের ১৭টি সবই আমাদের ইশতেহারে থাকবে। আমরা এখন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমাদের এই ইশতেহার দেশের জন্য মঙ্গল হবে, এবং বিশ্বে আমাদের একটা অবস্থান সৃষ্টি হবে।

একাত্তর: ভোটার উপস্থিতি ও ভোটের অংশগ্রহণ নিয়ে আপনারা কোনো চাপ অনুভব করছেন কিনা?

একে আব্দুল মোমেন: ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে। ২৪ শতাংশ বা তারও কম। ওটাকে আমরা বলি-ভোটারবিহীন নির্বাচন। যার কারণে খালেদা জিয়ার টিকতে পারেনি। আর সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে। প্রায় ৮৮ শতাংশ।

আমরা এবারে আশা করবো, ভোটারদের পরিমাণ বাড়বে। এ নিয়ে আমাদের প্রচেষ্টা আছে। বিএনপি না আসলেও অনেক বিএনপি নেতা তাদের নেতৃত্বের প্রতি অসন্তুষ্ট। তারা স্বতন্ত্র বা অন্য দলের হয়ে নির্বাচনে এসেছে। এটাই ভালো চিন্তা। আমরা একটা সুন্দর স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চাই। তার একটি ক্রাইটেরিয়া হচ্ছে, কতজন প্রার্থী হলো!

অন্যান্য দেশের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে কেউ প্রশ্ন করে না। অ্যামেরিকায় আমি যেখানে ছিলাম- সেখানে আমার দুই সিনেটর ছিল; এডওয়ার্ড এন কেনেডি, আরেকজন জন কেরি। জীবনে দুএকবার বোধহয় উনাদের ভোট দিতে হয়েছে। বাকি সব সময় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। কেউ প্রশ্ন তোলেনি। আমেরিকার বিভিন্ন শহরে সিনেটর, কংগ্রেসম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়। এটা কমন বিষয়। কিন্তু আমার দেশে এটা হলে সবাই চিৎকার শুরু করে।

আমার আসনেই সাতজন প্রার্থী। ছয় দলের ছয়জন, আরেকজন স্বতন্ত্র। নির্বাচনে হারজিত আছে। ইনশাআল্লাহ আমরা জিতবো। এবারে অনেকে বলবে, আওয়ামী লীগ জিতবে। খামোখা গিয়ে ভোট দিয়ে কী হবে! বিশেষ করে শিক্ষিত ও টাকাওয়ালা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে চান না। কিন্তু গরিবরা ভোট দেয়।

আমাদের দায়িত্ব হবে, তাদের ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসা। এজন্য আমাদের বাহন (রিকশা) দরকার হবে, তাদের নিয়ে আসতে। আমরা চাইবো, নির্বাচন কমিশন যাতে রিকশাটা এলাও করবে। আমাদের জন্য অধিকতর লোক ভোট কেন্দ্রে আনা ও ভোট দেওয়া আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে। এই নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু হবে। কোনো ধরনের কারচুপি হবে না। কোনো ধরনের ভুয়া ভোট হবে না। আর এ নিয়ে আমাদের উপর কোনো ধরনের চাপ অনুভব করছি না।

একাত্তর: আমরা কি সরাসরি নির্বাচনের জন্য যোগ্য নারী প্রার্থী পাচ্ছি না?

একে আব্দুল মোমেন: সরাসরি নির্বাচনের জন্য যার গ্রহণযোগ্যতা আছে, দলের প্রতি সম্পৃক্ততা আছে, কর্মসূচিতে সক্রিয়, তাদেরই দেওয়া হয়। যাদের দেওয়া হয়েছে, সেটি সংখ্যায় আগের চেয়ে বেশি। আমাদের নারীরা তো সেভাবে এগিয়ে আসে না। যার জন্য আমরা কোটা সিস্টেম করেছি। ৫০ জন নারী সংরক্ষিতভাবে নিবো। নারী এখনও সব জায়গায় আসেনি।

অনেক নারী নেতৃত্ব যারা সংসদ সদস্য হয়েছিলেন, তারাওতো কার্যকরী প্রক্রিয়ায় নিজের এলাকায় অবস্থান তৈরি করেনি। এটা একটা প্রক্রিয়া, সময়ের সঙ্গে বাড়বে। শেখ হাসিনা যতদিন আছে, ততদিন তাদের অবস্থান বাড়তে থাকবে।

একাত্তর: স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়িয়েছে অনেক। এতে ভোট ভাগাভাগি হয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হবেন কিনা?

একে আব্দুল মোমেন: নিশ্চয় ভাগাভাগি হবে। যেমন- আমার ওখানে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ লোক। আওয়ামী লীগের তিন বারের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। সারাজীবন আওয়ামী লীগের জন্য সংগ্রাম করেছেন। নৌকাকে জেতাতে অতীতে অনেক কাজ করেছেন। এবার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র দাঁড়িয়েছেন। তারও তো অনেক ভোট আছে। তিনি তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ে দাঁড়িয়েছেন, এটা ভালো, আমি তাকে স্বাগত জানাই। সারাদেশে দলের সভাপতিও এটি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।

তবে, আমার একটা বিশ্বাস- আপনি যদি মনে দিলে আওয়ামী লীগের লোক হন। আপনি তখন এমন কাজ করবেন না যে, আওয়ামী লীগ রসাতলে যাক। আপনি তখন স্বেচ্ছায় নিজের স্বার্থ জ্বলাঞ্জলি দিয়ে আপনি আপনার পার্টির স্বার্থকে রক্ষা করবেন। এ কারণে আসন হারানোর শঙ্কা আছে। তবে অনেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহারও করে নিবে।

একাত্তর: সিলেট -১ আসনে যিনি বিজয়ী হন, তার দলই সরকার গঠন করে, এটি কি রেওয়াজ?

একে আব্দুল মোমেন: আমি সবার কাছে দোয়া চাই, যেন বিজয়ী হয়ে আসতে পারি এবং আমার দল যেন সরকার গঠন করতে পারে।