নজরুলের কবিতায় দাদিকে স্মরণ করে জাইমা রহমানের আবেগঘন পোস্ট 

সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পঙক্তি দিয়ে এক হৃদয়স্পর্শী শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন তাঁর নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। দাদির মৃত্যুর পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই আবেগঘন পোস্ট দেন তিনি।

জাইমা রহমান তাঁর ফেসবুক পোস্টে নজরুলের বিখ্যাত ‘বিদায়-বেলায়’ কবিতার শুরুর দিকের অংশটি তুলে ধরেন- ‘তুমি অমন ক’রে গো বারে বারে জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না, জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না। ঐ কাতর কণ্ঠে থেকে থেকে শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না, শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না’।

কবিতার প্রতিটি ছত্রে যেন ফুটে উঠেছে দাদিকে হারানোর এক গভীর অন্তর্দাহ এবং বিদায়ের অব্যক্ত যন্ত্রণা। জাইমার শেয়ার করা এই কবিতাটি নজরুলের সেই মনস্তাত্ত্বিক দর্শনের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে জীবনের চরম শোক আর বিদায়কেও শান্তভাবে গ্রহণ করার এক আর্তি থাকে।

কবিতার পাশাপাশি জাইমা রহমান একটি দুর্লভ ছবিও শেয়ার করেছেন। ছবিতে দেখা যায়, তিনি দাদি বেগম খালেদা জিয়ার মুখোমুখি বসে আছেন এবং পরম মমতায় কোনো এক বিষয়ে কথা বলছেন। আর নাতনির প্রতিটি কথা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনছেন দাদি। 

ধারণা করা হচ্ছে, ছবিটি গত বছরের কোনো এক সময়ে তোলা, যখন বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছিলেন। নাতনি ও দাদির এই নির্মল মুহূর্তটি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে গভীর আবেগের সৃষ্টি করেছে।

দাদির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ২৩ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফেরার আগে একবার আবেগঘন পোস্ট দিয়েছিলেন জাইমা। তখন বেগম খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন। 

নতুন বছরের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে দেওয়া এই পোস্টটি নেত্রীর মৃত্যুর পর জাইমার পক্ষ থেকে প্রথম আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ।
জাতীয় কবির কবিতার মাধ্যমে জাইমা রহমান যেন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত শোককেই প্রকাশ করেননি, বরং বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ, তাকেও এক সুতোয় গেঁথেছেন। বিদায়ের এই দিনে নজরুলের কালজয়ী পঙক্তিগুলো জাইমার হৃদয়ের রোদনকেই প্রতিনিধিত্ব করছে।

গত মঙ্গলবার ভোরে বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয় দাদুর মৃত্যুতে জাইমা রহমানের এমন কাব্যময় এবং জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের কবিতা দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি তাঁর ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে এক অনন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।

পাঠকদের জন্য কবিতাটি তুলে ধরা হলো- 

তুমি অমন ক’রে গো বারে বারে জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না,
জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না।
ঐ কাতর কণ্ঠে থেকে থেকে শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না,
শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না।

হাসি দিয়ে যদি লুকালে তোমার সারা জীবনের বেদনা,
আজো তবে শুধু হেসে যাও, আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না।
ঐ ব্যথাতুর আঁখি কাঁদো-কাঁদো মুখ
দেখি আর শুধু হেসে যাও,আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না।
চলার তোমার বাকী পথটুকু-
পথিক! ওগো সুদূর পথের পথিক-
হায়, অমন ক’রে ও অকর”ণ গীতে আঁখির সলিলে ছেয়ো না,
ওগো আঁখির সলিলে ছেয়ো না।।

দূরের পথিক! তুমি ভাব বুঝি
তব ব্যথা কেউ বোঝে না,
তোমার ব্যথার তুমিই দরদী একাকী,
পথে ফেরে যারা পথ-হারা,
কোন গৃহবাসী তারে খোঁজে না,
বুকে ক্ষত হ’য়ে জাগে আজো সেই ব্যথা-লেখা কি?
দূর বাউলের গানে ব্যথা হানে বুঝি শুধু ধূ-ধূ মাঠে পথিকে?
এ যে মিছে অভিমান পরবাসী! দেখে ঘর-বাসীদের ক্ষতিকে!
তবে জান কি তোমার বিদায়- কথায়
কত বুক-ভাঙা গোপন ব্যথায়
আজ কতগুলি প্রাণ কাঁদিছে কোথায়-
পথিক! ওগো অভিমানী দূর পথিক!
কেহ ভালোবাসিল না ভেবে যেন আজো
মিছে ব্যথা পেয়ে যেয়ো না,
ওগো যাবে যাও, তুমি বুকে ব্যথা নিয়ে যেয়ো না।