জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটপ্রবণতা এবং নারীদের রাজনৈতিক অধিকার ও অংশীদারত্ব উপেক্ষিত হওয়ার তীব্র অভিযোগ এনে বৃহস্পতিবার এক ফেসবুক পোস্টে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
ফেসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন জানান, দীর্ঘ প্রায় ১১ মাস ধরে দলের অভ্যন্তরে মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন তিনি। দল ভুল পথে গেলে তা শুধরে নেওয়ার রাজনৈতিক কর্তব্য থেকেই তিনি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত প্রস্তাব ও আলোচনা করেছেন।
তবে তিনি মনে করেন, এনসিপি তার শুরুর মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক লাইন ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। পুরোনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে নিজস্ব পরিচয় ও কর্মসূচি তৈরি করতে না পেরে দলটি শেষ পর্যন্ত বড় রাজনৈতিক দল ও অতি-ডানপন্থী শক্তির লেজুড়বৃত্তিতে পর্যবসিত হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
জামায়াত প্রসঙ্গে কঠোর অবস্থান: পদত্যাগপত্রে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট ও বোঝাপড়াকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন সামান্তা শারমিন। তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য নয় এবং তাদের সঙ্গে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে, এ কথা আমি আগেই বলেছিলাম।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, জামায়াত প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক সংস্কারের রাজনীতি ধারণ করে না; বরং তাদের দার্শনিক ভিত্তি ও রাষ্ট্রপ্রকল্প ফ্যাসিবাদী। একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়া এবং সংস্কারের পথকে কুক্ষিগত করার ভণিতা হিসেবে জামায়াত রাজনীতি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এনসিপি জামায়াতের প্রভাবে নিজেদের হারিয়ে ফেলেছে এবং অভ্যুত্থানোত্তর নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে বলে অভিযোগ করেন এই নেত্রী।
নির্বাচনী কৌশল ও অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার: ২৬-এর নির্বাচনকে একটি পরিবর্তনমুখী রাজনৈতিক নির্বাচন হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ এনসিপি হাতছাড়া করেছে বলে মনে করেন সামান্তা শারমিন। ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শিক্ষা ও বিকল্প কৌশল এড়িয়ে ‘বড় পার্টির সাথে জোট’ করার পুরোনো ও অগণতান্ত্রিক কৌশলে হাঁটায় দলের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কার্যকারিতা নষ্ট হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। শহিদ ওসমান হাদীর মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অগণতান্ত্রিক নির্বাচনি কৌশল জায়েজ করতে এই মর্মান্তিক ঘটনাকে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অভ্যুত্থানে নারীর অধিকার ও মালিকানা প্রসঙ্গ: ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সামান্তা শারমিন অভিযোগ করেন, বিজয়ের পর থেকেই পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক পক্ষ ও দলগুলো নারীদের বিজয়ের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে সক্রিয় হয়েছে। এনসিপিও এই নারীবিরোধী ও রক্ষণশীল প্রবণতার বাইরে যায়নি। দলটির সাংগঠনিক কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও নারী কোণঠাসা হওয়ার সংস্কৃতি পুনরুৎপাদিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রায় এক বছরের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতি টেনে সামান্তা শারমিন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, পুরোনো ব্যবস্থার রাজনৈতিক দল কখনো রাষ্ট্রের নতুন ব্যবস্থা আনার জন্য সহায়ক হতে পারে না, বরং এটি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীর সামনে দলের ভেতরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেই তিনি এনসিপির সঙ্গে নিজের সমস্ত সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেন।