২০০৭ সাল। বার্সেলোনার এক তরুণ ফুটবলারের বয়স তখন মাত্র ২০। অন্যদিকে, নীল রঙের একটি ছোট্ট প্লাস্টিকের বাথটাবে বসে থাকা শিশুটির বয়স মাত্র পাঁচ-ছয় মাস। একটি দাতব্য ফটোশুটে সেই তরুণ ফুটবলার শিশুটিকে আলতো করে গোসল করাচ্ছেন। প্রথমে শিশুটিকে কোলে নিতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলেও, শেষ পর্যন্ত হাসিমুখেই সম্পন্ন করেন পুরো ফটোশুট। কেউই তখন কল্পনা করতে পারেননি, প্রায় দুই দশক পর বিশ্বকাপের ফাইনালে শিরোপার লড়াইয়ে এই দুজনই হবেন একে অপরের প্রতিপক্ষ।
সেই তরুণ ছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি। আর শিশুটি—আজকের স্পেনের বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামাল।
ছবিটি তোলা হয়েছিল বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন, কাতালান সংবাদপত্র দিয়ারিও স্পোর্ত এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে ২০০৮ সালের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য। ক্যালেন্ডার বিক্রির অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল বিশ্বের শিশুদের কল্যাণে। সে সময় অভিবাসী হিসেবে বসবাস করা লামিনে ইয়ামালের পরিবার একটি লটারিতে নির্বাচিত হয়েছিল বলেই এই ফটোশুটের সুযোগ পেয়েছিল। সেই সৌভাগ্যই পরে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিন ছবিগুলো প্রায় বিস্মৃতই ছিল। প্রায় ১৭ বছর ধরে সেগুলো জনসমক্ষে খুব একটা আলোচনায় আসেনি। ২০২৪ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ইয়ামালের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর তার বাবা ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করলে সেগুলো মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। পরে ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্তও জানান, তখন তিনি নিজেও জানতেন না যে তার ক্যামেরাবন্দি সেই শিশুটি একদিন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হবে।
এবার সেই গল্পে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে, ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো সত্যি। শুধু তাই নয়, মেসি ও লামিনে ইয়ামাল—দুজনই এখন ইউনিসেফের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর। মাঠে তারা কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা, আর মাঠের বাইরে শিশুদের অধিকার, নিরাপত্তা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নিজেদের কণ্ঠ ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাচ্ছেন।
ইউনিসেফ বলছে, তাদের লক্ষ্য একটাই—‘প্রতিটি শিশু যেন বেঁচে থাকে, বিকশিত হয় এবং নিজের সর্বোচ্চ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন কাকতালীয় মুহূর্তগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে। কেউ বলছে, এটি যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। আবার কেউ লিখেছে, ‘একসময় যে শিশুটিকে কোলে নিয়েছিলেন মেসি, আজ সেই তরুণই বিশ্বকাপের ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ।’
ফুটবলে ট্রফি, গোল কিংবা রেকর্ডের গল্প নতুন নয়। কিন্তু একটি দাতব্য ফটোশুটে কোলে নেওয়া শিশুর সঙ্গে প্রায় দুই দশক পর বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে মুখোমুখি হওয়া—এমন গল্প সত্যিই বিরল। তাই মেসি ও লামিনে ইয়ামালের এই ছবিটি এখন শুধু একটি স্মৃতি নয়; এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অসাধারণ ‘ফুল সার্কেল’ মুহূর্তগুলোর একটি।