তৃতীয় দিন শেষে আলো স্বল্পতার কারণে যখন খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো, তখন সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের বাতাসে এক অবিশ্বাস্য অর্জনের সুবাস। স্পিনবান্ধব উইকেটে এক রূপকথার প্রত্যাবর্তনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ পিছিয়ে আছে ২৩ রানে। এর আগে ৩০ রানের লিড নেয় বাংলাদেশ, আর এই অসাধ্য সাধনের একক নায়ক তৌহিদ হৃদয়। মাত্র তিন টেস্টের ক্যারিয়ারে ২৪২ রানের মহাকাব্যিক এক ইনিংস খেলে তিনি নাম লিখিয়েছেন রেকর্ডের পাতায়।
তবে ম্যাচের চিত্রপট একসময় পুরোপুরি ক্যারিবীয়দের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। দিনকয়েক আগে প্রথম দিন সকালে ওপেনার শাদমান ইসলাম বাম পায়ের গোড়ালিতে চোট পাওয়ায় বাংলাদেশ বাধ্য হয়েছিল মাত্র ১০ জন ব্যাটার নিয়ে খেলতে। এরপর দিনের শুরুতে জোমেল ওয়ারিকানের ঘূর্ণি জাদুতে মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ সাজঘরে ফিরে গেলে ১৮৪ রানে সাত উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়ে স্বাগতিকরা। দুপুরের খাবারের বিরতির আগের সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিলো, বড়ো ব্যবধানে পিছিয়ে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
কিন্তু এরপরই শুরু হয় ‘হৃদয়-নামা’। মাত্র শেষ দুই ব্যাটারকে সঙ্গী করে একাই দলের হাল ধরেন তৌহিদ হৃদয়। তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে শেষ দুই উইকেটে অবিশ্বাস্যভাবে যোগ হয় ২০২ রান।
দিনের দ্বিতীয় সেশনে একদম বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেন হৃদয়। ১০০ রান পূর্ণ করার পর লোয়ার অর্ডার ব্যাটারদের দারুণভাবে আগলে রেখে নিজের কাঁধে স্ট্রাইকের পুরো দায়িত্ব তুলে নেন তিনি। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই সিঙ্গেল নেননি, যাতে প্রান্ত বদল না হয়ে স্ট্রেইক নিজের কাছে থাকে। শামীম জোসেফের বলে আপার-কাট শটে বাউন্ডারির প্রদর্শনী শুরু করে রস্টন চেসের ওভারে একের পর এক ছক্কা হাঁকান এই ডানহাতি ব্যাটার।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় নতুন বল হাতে নিয়েও কোনো ফায়দা তুলতে পারেনি। উল্টো তাইজুল ইসলাম সিলস ও জোসেফের বলে বেশ কয়েকটি বাউন্ডারি আদায় করে নেন। এদিকে জোসেফের বল ফ্লিক করে দেড়শ রান পূর্ণ করার পর থামানো যায়নি হৃদয়কে। ১৭২ রান টপকে তিনি ছাড়িয়ে যান গত বছর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মাহমুদুল হাসান জয়ের করা ১৭১ রানের রেকর্ড—গড়ে ফেলেন সিলেটে টেস্ট ক্রিকেটে যেকোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহের নতুন রেকর্ড।
চা-বিরতির ঠিক পরের ওভারে জোমেল ওয়ারিকানের বল থেকে এক রান নিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির জাদুকরী ছোঁয়া পান হৃদয়। এটি টেস্ট ক্রিকেটে চতুর্থ বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে দ্বিশতকের কীর্তি। একই সঙ্গে মুশফিকুর রহিমের ২০১৮ সালের ২১৯ রানের রেকর্ড ভেঙে এটি এখন বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।
ডাবল সেঞ্চুরি করার পরও হৃদয়ের থামার কোনো লক্ষণ ছিলো না। বিশপের বলে ছক্কা হাঁকিয়ে তিনি ভেঙে দেন এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার তামিম ইকবালের রেকর্ড। একে একে ইনিংসের মোট ১১টি ছক্কা হাঁকান তিনি। যা টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার বিশ্বরেকর্ডের চেয়ে মাত্র একটি কম। শেষ পর্যন্ত তাইজুল (২২ রান, ৫৬ বল) ও দারুণ সঙ্গ দেওয়া তাসকিন আহমেদ বিদায় নিলে ৩৮৬ রানে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। দিনশেষে হৃদয় অপরাজিত থাকেন ২৪২ রান নিয়ে।
পুরো ইনিংসে তাইজুল ও তাসকিন মিলে ২৮৭ বলের মধ্যে ৮৫ বল মোকাবিলা করে দারুণ প্রতিরোধ গড়েন। অন্যদিকে, ক্যারিবীয় শিবিরও কিছু ভুল কৌশল প্রয়োগ করে; ফিল্ডারদের বৃত্তের কাছাকাছি না এনে এবং ওভারের শেষ দুই বলেও সিঙ্গেল নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় হৃদয়ের পথ আরও সহজ হয়ে যায়।
ম্যাচের প্রথম অংশে জোমেল ওয়ারিকান (মুশফিক ও লিটনের উইকেট শিকার) দুর্দান্ত বোলিং করলেও শেষ পর্যন্ত তৌহিদ হৃদয়ের অবিস্মরণীয় ইনিংসে ভর করেই চালকের আসনে বসেছে বাংলাদেশ। দিনশেষে দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠ ছেড়েছে স্বাগতিক শিবির।
শেষ বিকেলে উইন্ডিজের ব্যাটাররা চার ওভার ব্যাট করেছেন। কোনো উইকেট না হারিয়ে তাদের সংগ্রহ সাত রান। ব্যাট করছেন ব্যান্ডন কিং ৫* ও ডি সিলভা ২*।