পর্তুগিজ কোচর কাছে বিশ্বকাপটা এক অজানা গোলকধাঁধা

ফুটবল বিশ্বকাপ কোনো গাণিতিক সমীকরণ নয়, বরং এটি গরম, আর্দ্রতা, পেনাল্টি শুটআউট, ভাগ্যের খেলা আর আকস্মিক ঝড়ের এক গোলকধাঁধা, বিশ্বকাপের মঞ্চকে ঠিক এভাবেই বর্ণনা করেছেন পর্তুগাল ফুটবল দলের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। ২০১৮ এবং ২০২২, দুইটি বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের ডাগআউট সামলানোর পর, এবার পর্তুগালের ম্যানেজার হিসেবে মার্তিনেজের সামনে অপেক্ষা করছে এক রোমাঞ্চকর ও কঠিন চ্যালেঞ্জ। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ- শিরোপা জয়।

বৃহস্পতিবার লিসবনে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্তিনেজ বলেন, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নেতৃত্বাধীন পর্তুগাল দল দুর্দান্ত ফর্মে থাকলেও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে তার মূল্য খুব সামান্যই। কারণ, তিন দেশে অনুষ্ঠিতব্য ৪৮ দলের এই বর্ধিত বিশ্বকাপ দলগুলোকে এক সম্পূর্ণ ‘অজানা’ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাঁর কাছে বিশ্বকাপ হলো অনেক অজানাকে জয় করার আসর।

Ronaldo Portugal 01
মার্তিনেজের ভাষায়, আমরা এক অজানা রাজ্যে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। ৪৮টি দলের খেলা মানে টুর্নামেন্ট দীর্ঘ হওয়া। এর জন্য খেলোয়াড়দের মধ্যে অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তি ও সহনশীলতা থাকা প্রয়োজন। আপনি আগে থেকে কোনো ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারবেন না; আপনাকে শুধু যে কোনো পরিস্থিতিতে লড়াই করার জন্য দলকে তৈরি রাখতে হবে।

বাছাই পর্বের সব ম্যাচে জয় এবং নেশনস লিগের শিরোপা জিতে পর্তুগাল বেশ ফুরফুরে মেজাজেই বিশ্বকাপে যাচ্ছে। তবে মাঠের এই ফর্মকে অতি-আত্মবিশ্বাসে রূপ দিতে নারাজ পর্তুগিজ কোচ। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আমরা এ পর্যন্ত যা করেছি, তা শুধু বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেবে, তার বেশি কিছু নয়। বিশ্বকাপে যাওয়ার পর গ্রুপ পর্বের ওই তিনটি ম্যাচ থেকেই সব কিছু নতুন করে শুরু হবে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপে ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের সদস্য হিসেবে মার্তিনেজ কাজ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা এবার পর্তুগাল দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, এবারের লড়াইটা শুধু কৌশলের নয়, বরং আবহাওয়া, যাতায়াত এবং মানসিকতারও।

Ronaldo Portugal 03
আমেরিকার ভৌগোলিক পরিস্থিতি উল্লেখ করে মার্তিনেজ বলেন, ভিন্ন টাইম জোন, তীব্র গরম, আর্দ্রতা এবং যে কোনো মুহূর্তে ধেয়ে আসা ঝড়ের মতো অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে খেলা কতটা জটিল, তা আমি দেখেছি। ইউরোপের চেনা পরিবেশের চেয়ে এই পরিস্থিতিতে ফুটবল খেলার ধরন একেবারেই আলাদা।  এছাড়াও দলগুলো কীভাবে তাদের বেস ক্যাম্প ব্যবহার করবে,কেউ এক জায়গায় থিতু হবে নাকি ম্যাচের শহরগুলোর কাছাকাছি ঘুরবে, সেসব খুঁটিনাটি বিষয়ও তিনি খতিয়ে দেখেছেন।

বিশ্বকাপের ভূগোল যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তা মার্তিনেজ খুব ভালো করেই জানেন। রাশিয়ার বিশাল দূরত্ব আর কাতারের এক হোটেলে থেকে খেলার অভিজ্ঞতার তুলনা টেনে তিনি এবারের টুর্নামেন্টের বিশালতার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলেন।

বিশ্বকাপের আনন্দ এবং নির্মমতা, উভয়েরই সাক্ষী এই স্প্যানিশ কোচ। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কোচ থাকাকালীন কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারানোর মানসিক বাধা যেমন তিনি টপকেছেন, তেমনি সেমিতে হেরে যাওয়ার চরম কষ্টও বুকে চেপেছেন। সেই যন্ত্রণার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেমিতে হারা মানে কেউ যেন আপনার বুক থেকে ফাইনাল খেলার স্বপ্নটা টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে নিয়ে গেল।

এই অতীত অভিজ্ঞতাই তাকে শিখিয়েছে যে, শুধু সুন্দর ফুটবল খেললেই বিশ্বকাপ জেতা যায় না। মার্তিনেজ বলেন, বিশ্বকাপ জয়ের জন্য আপনি কখনোই শতভাগ প্রস্তুত থাকতে পারবেন না। এই পথচলার মধ্যেই আপনাকে পথ খুঁজে নিতে হবে। প্রতিপক্ষ কেমন খেলছে, মাঠে কী ঘটছে এবং ভাগ্য আপনার কতটা সহায়, সব কিছুর ওপরই সাফল্য নির্ভর করে।

Ronaldo Portugal 04
রিয়াল মাদ্রিদ কোচ কার্লো আনচেলত্তির একটি মন্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন মার্তিনেজ, যেখানে আনচেলত্তি বলেছিলেন, সবচেয়ে সেরা দল নয়, বরং সবচেয়ে সহনশীল দলই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জেতে। মার্তিনেজ যোগ করেন, একটি পেনাল্টি শুটআউট, ডি-বক্সের ভেতর একটি সঠিক সিদ্ধান্ত কিংবা বল পোস্টে লেগে ভেতরে ঢুকল নাকি বাইরে গেল, এই সামান্য ভাগ্যই পার্থক্য গড়ে দেয়। বিশ্বকাপে জিততে হলে মেধা বা প্রতিভার বাইরেও কিছু গুণের প্রয়োজন হয়। দলের ঐক্য, সহনশীলতা এবং কঠিন পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতাই আসল তফাত গড়ে দেয়।

পর্তুগাল দলে প্রতিভার কোনো কমতি নেই, তবে ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ তাদের ফুটবল কৌশলের পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতারও এক কঠিন পরীক্ষা নেবে। কারণ ৪৮টি দল আর ৩টি দেশের এই মেগা আসরে ভুলের মাশুল হবে অনেক চড়া।