আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ শুরু হতে আর মাত্র অল্প কিছুদিন বাকি। আগামী ১১ জুন মেক্সিকোতে উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে এই বিশ্বমঞ্চের। ইতিমধ্যে টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাওয়া ৪৮টি দল তাদের প্রাথমিক স্কোয়াড চূড়ান্ত করতে শুরু করেছে।
এখন সবার নজর স্বাগতিক তিন দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় গিয়ে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ম্যাচ ও অনুশীলন পর্ব সেরে নেওয়ার দিকে। অন্যদিকে, দলগুলোকে স্বাগত জানাতে স্বাগতিক দেশগুলোর হোটেল ও আবাসন খাত এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
বিশ্বকাপের এই বিশাল আয়োজনে অংশ নেওয়া দলগুলোর সুবিধার্থে প্রতিটি দেশের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট 'বেস ক্যাম্প'। মূলত টুর্নামেন্ট শুরুর আগের প্রস্তুতি, স্থানীয় আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো চলাকালীন দলগুলোর মূল ঠিকানা হিসেবে এই বেস ক্যাম্পগুলো ব্যবহৃত হয়।
এখানে খেলোয়াড়দের থাকার সুব্যবস্থা ছাড়াও থাকে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল মাঠ, জিমনেসিয়াম, ম্যাচ-পরবর্তী ক্লান্তি দূর করার রিকভারি সেন্টার এবং পারফরম্যান্স মূল্যায়ন কেন্দ্র। স্বাগতিক তিন দেশ এই ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেলেও বাকি ৪৫টি দেশকে দীর্ঘ ভ্রমণ ও জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে লড়াই করেই মাঠে নামতে হবে।
ফিফার অনুমোদিত তালিকা থেকে প্রতিটি দল তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচের ভেন্যু ও নিজেদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে বেস ক্যাম্প বেছে নিয়েছে। স্থানীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্স, বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক মাঠ এবং বিলাসবহুল হোটেলগুলোর সমন্বয়ে ক্যাম্পগুলো তৈরি করা হয়েছে।
আগামী ১১ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে দলগুলো সেই ক্যাম্পেই অবস্থান করবে। পরবর্তী রাউন্ডে ওঠা ৩২টি দল চাইলে একই ক্যাম্পে থাকতে পারবে কিংবা তাদের পরবর্তী ভেন্যুর কাছাকাছি চলে যেতে পারবে।
গ্রুপ 'এ' থেকে শুরু করে সব দলের ক্যাম্পগুলো সাজানো হয়েছে বেশ চমৎকারভাবে। যেমন আলজেরিয়া তাদের বেস ক্যাম্প করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের লরেন্সে। রক চক পার্কে অনুশীলন করবে তারা, আর তাদের প্রথম ম্যাচ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কানসাস সিটি স্টেডিয়ামেই অনুষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তাদের ডেরা গেঁড়েছে মিসৌরির কানসাস সিটিতে। স্পোর্টিং কেসি পারফরম্যান্স সেন্টারে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে লিওনেল মেসির দল অনুশীলন করবে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের মতোই এবারও তারা কানসাসের হোটেল স্যাভয়ে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী বার্বিকিউ মাংস রান্নার বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া তাদের ক্যাম্প করেছে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে, যেখানে তারা ওকল্যান্ড রুটস স্পোর্টস ক্লাবে অনুশীলন করবে। একই গ্রুপে থাকা অস্ট্রিয়া ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারার দৃষ্টিনন্দন পরিবেশে রিজ কার্লটন হোটেলে থাকবে এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার মাঠে অনুশীলন করবে।
ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি বেলজিয়াম ওয়াশিংটনের রেন্টনে সিয়াটল সাউন্ডার্স ট্রেনিং সেন্টারে নিজেদের ঝালিয়ে নেবে। দীর্ঘ এক দশক পর বিশ্বকাপে ফেরা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা তাদের ক্যাম্পের জন্য বেছে নিয়েছে মিসৌরির সেন্ট লুইস শহরকে। যদিও এই রাজ্যে তাদের কোনো ম্যাচ নেই, তবে ইউরোপের বাইরে এই শহরেই সবচেয়ে বেশি বসনিয়ান মানুষ বসবাস করেন।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল তাদের বেস ক্যাম্পের জন্য বেছে নিয়েছে বিখ্যাত নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সি অঞ্চলকে। তারা কলম্বিয়া পার্ক ট্রেনিং ফ্যাসিলিটিতে অনুশীলন করবে। স্বাগতিক কানাডা ঘরের মাঠের সুবিধা নিতে তাদের দুই গ্রুপ ম্যাচ খেলার শহর ভ্যাঙ্কুভারেই বেস ক্যাম্প তৈরি করেছে।
বিশ্বকাপে নবাগত কেপ ভার্দে ফ্লোরিডার টাম্পাকে তাদের আস্তানা বানিয়েছে। লাতিন আমেরিকার দল কলম্বিয়া মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার সর্বাধুনিক 'অ্যাটলাস এজিএ একাডেমি'-তে অনুশীলন করবে। গত বিশ্বকাপের অন্যতম সফল দল ক্রোয়েশিয়া তাদের গ্রুপ পর্বের কোনো ম্যাচের ভেন্যুতে না থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজ্য ভার্জিনিয়ার আলেকজান্দ্রিয়াকে বেছে নিয়েছে।
আরেক নবাগত দল কুরাসাও ফ্লোরিডার পাম বিচ কাউন্টিতে ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির মাঠ ব্যবহার করবে। দীর্ঘ ২০ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা চেক প্রজাতন্ত্র টেক্সাসের ম্যান্সফিল্ডে মাল্টিপারপাস স্টেডিয়ামে অনুশীলন করবে। কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (সাবেক জাইরে) ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে ফিরল, আর তারা তাদের বেস ক্যাম্প করেছে টেক্সাসের হিউস্টনে।
তরুণ দল নিয়ে গড়া ইকুয়েডর ওহাইওর কলম্বাসে কলম্বাস ক্রু পারফরম্যান্স সেন্টারে অনুশীলন করবে। মিশরের তারকা মোহামেদ সালাহ ও তার দল ওয়াশিংটনের স্পোকেন শহরের গঞ্জাগা ইউনিভার্সিটিতে থাকবে, যা তাদের কানাডা ও আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের ম্যাচগুলোর সাথে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনার পাশাপাশি ইংল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসও তাদের বেস ক্যাম্প বানিয়েছে। হ্যারিকেনের দল সোয়াপ সকার সেন্টারে অনুশীলন করবে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস থাকবে হোটেল কানসাস সিটিতে, যারা ক্যাসির আধুনিক নারী ফুটবল ক্লাবের মাঠটি অনুশীলনের জন্য ব্যবহার করবে।
দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ম্যাসাচুসেটসের ওয়ালথামে বেন্টলে ইউনিভার্সিটিতে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে অনুশীলন করবে। চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি উত্তর ক্যারোলিনার উইনস্টন-সালেমে ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটির স্টেডিয়ামে প্রস্তুতি নেবে; কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যানের চাহিদা অনুযায়ী এখানে দলটিকে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা দেওয়া হবে।
ঘানা তাদের বেস ক্যাম্প করেছে রোড আইল্যান্ডের স্মিথফিল্ডে, যার পেছনে এখানকার চমৎকার সাংস্কৃতিক জীবনও ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর বিশ্বকাপে ফেরা হাইতি নিউ জার্সির গ্যালোওয়ে টাউনশিপের স্টকটন ইউনিভার্সিটিকে বেছে নিয়েছে।
ইরানকে নিয়ে নানা রাজনৈতিক ধোঁয়াশা থাকলেও অ্যারিজোনার টুসান শহরের কিনো স্পোর্টস কমপ্লেক্সে তাদের স্বাগত জানাতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। ইরাক দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ার এক বিলাসবহুল রিসোর্টে রাজকীয়ভাবে অবস্থান করবে, যেখানে এর আগে ২৮ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবস্থান করেছেন।
আইভরি কোস্ট পেনসিলভেনিয়ার চেস্টারে বিখ্যাত এমএলএস ভেন্যু ফিলডেলফিয়া ইউনিয়নের মাঠে অনুশীলন করবে। জাপানের দল থাকবে টেনেসি রাজ্যের অ্যান্টিওক শহরে। জর্ডান তাদের বিশ্বকাপের প্রথম অভিজ্ঞতা নিতে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের পোর্টল্যান্ড ইউনিভার্সিটির মাঠ বেছে নিয়েছে।
আরেক স্বাগতিক মেক্সিকো তাদের রাজধানী মেক্সিকো সিটির 'চেন্ত্রো দে আলতো রেন্দিমিয়েন্তো'-তে অবস্থান ও অনুশীলন করবে। এটি বিখ্যাত অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত এবং উচ্চতার কারণে মেক্সিকান খেলোয়াড়রা এখানে জলবায়ুর বিশেষ সুবিধা পাবেন।
মরক্কো নিউ জার্সির বাস্কিং রিজের পিংরি স্কুলে অনুশীলন করবে, যা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপেও একটি বেস ক্যাম্প ছিল। নিউজিল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড, উভয় দলই ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোতে অবস্থান করবে। নরওয়ে উত্তর ক্যারোলিনার গ্রিনসবোরো ইউনিভার্সিটিতে মার্টিন ওডেগার্ডের অধীনে অনুশীলন করবে এবং এখানে তারা একটি উন্মুক্ত অনুশীলন সেশনও রাখবে।
স্বাগতিক কানাডা ছাড়া একমাত্র পানামাই কানাডার মাটিতে (অন্টারিও) তাদের বেস ক্যাম্প করেছে। প্যারাগুয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে স্টেট ইউনিভার্সিটিতে থাকবে।
ফুটবল জাদুকর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল দল ফ্লোরিডার পাম বিচ কাউন্টিতে গার্ডেন নর্থ কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট পার্কের ১০টি মাঠের বিশাল কমপ্লেক্সে অনুশীলন করবে। কাতার দল অস্ট্রিয়ার সাথে সান্তা বারবারার ওয়েস্টমন্ট কলেজে ক্যাম্প করেছে।
সৌদি আরব টেক্সাসের অস্টিন এফসি স্টেডিয়ামে অনুশীলন করবে; ২০৩৪ বিশ্বকাপের এই আয়োজক দেশটি ১৯৯৪ সালের পর আবারও আমেরিকার মাটিতে তাদের সেরাটা দিতে মুখিয়ে আছে। স্কটল্যান্ড উত্তর ক্যারোলিনার শার্লটে তাদের বেস ক্যাম্প করেছে, যেখান থেকে বোস্টন ও মিয়ামির বিমান দূরত্ব মাত্র দুই ঘণ্টার। সেনেগাল নিউ জার্সির রুটগার্স ইউনিভার্সিটিতে অনুশীলন করবে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হতে যাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকা মেক্সিকোর পাচুকায় ফিফা সার্টিফাইড মেডিকেল সেন্টারসমৃদ্ধ ক্যাম্পে অবস্থান করছে। দক্ষিণ কোরিয়া মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার উচ্চতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে লিগা এমএক্স-এর ক্লাব চিভাসের মাঠে থাকবে।
বিশ্বসেরা দল স্পেন টেনেসি রাজ্যের চ্যাটানুগার বিখ্যাত বেইলর স্কুলে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে (ব্ল্যাকআউট ফেন্স বা কালো বেড়া দিয়ে ঘেরা) অনুশীলন করবে। সুইডেন টেক্সাসের ফ্রিস্কোতে এফসি ডালাস স্টেডিয়ামে ক্যাম্প করেছে। তিউনিসিয়া মেক্সিকোর মন্তেরেইতে লাতিন আমেরিকার অন্যতম সেরা প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠে নিজেদের প্রস্তুত করবে।
তুরস্ক অ্যারিজোনার মেসায় আন্তর্জাতিক মানের ২৪টি মাঠের বিশাল কমপ্লেক্সে থাকবে। স্বাগতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্যালিফোর্নিয়ার আরভিনে এক সময়ের সামরিক বিমানঘাঁটি 'গ্রেট পার্ক স্পোর্টস কমপ্লেক্স'-কে তাদের প্রধান ঘাঁটি বানিয়েছে।
উরুগুয়ে মেক্সিকোর সমুদ্রসৈকত ঘেরা শহর প্লেয়া দেল কারমেনের বিলাসবহুল রিসোর্টে থাকবে। আর একদম নতুন দল হিসেবে ইতিহাস গড়া উজবেকিস্তান জর্জিয়ার মারিয়েটাতে আটলান্টা ইউনাইটেডের সদ্য উদ্বোধন হওয়া আধুনিক সেন্টারে তাদের বিশ্বকাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে।