ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবলকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে, তা বিশ্ববাসী ভালো করেই জানে। কিন্তু সেই ভালোবাসা যে কখনো কখনো বন্দুকের নলের মুখে গিয়ে ঠেকতে পারে, তা বোধহয় এবারই প্রথম দেখল দুনিয়া।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণার মুহূর্তে ইতালিয়ান হেড কোচ কার্লো আনচেলত্তির ওপর দেশটির সাধারণ ভক্তদের চাপ কতটা ‘প্রাণঘাতী’ ও স্নায়ুক্ষয়ী ছিল, তা প্রকাশ পেয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি শিউরে ওঠার মতো ভিডিওতে। পুরো দেশের কোটি কোটি চোখ যখন টিভির পর্দায়, তখন এক ব্রাজিলিয়ান সমর্থক হাতে আস্ত একটি রাইফেল নিয়ে আনচেলত্তির লাইভ সংবাদ সম্মেলন দেখছিলেন।
কোচ যখন একে একে খেলোয়াড়দের নাম ঘোষণা করছিলেন, তখন টিভির ওপাশে থাকা ওই সমর্থকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছিল। একপর্যায়ে সে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা আনচেলত্তির ছবি বরাবর সরাসরি নিজের রাইফেলটি তাক করে বসেন! সাফ হুমকি দেন, ফরওয়ার্ড লাইনের তালিকায় যদি নেইমার জুনিয়রের নাম না নেওয়া হয়, তবে তিনি স্ক্রিন লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে দেবেন।
সৌভাগ্যবশত, চরম নাটকীয়তা ও সাসপেন্সের পর আনচেলত্তি যখন সান্তোস তারকার নাম উচ্চারণ করেন, তখনই কেবল ওই উন্মাদ ভক্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অস্ত্রটি নামিয়ে নেন এবং প্রিয় আইডলের দলে থাকা নিশ্চিত হওয়ায় উল্লাসে মেতে ওঠেন। জনমতের এই তীব্র ও মারমুখী চাপকে উপেক্ষা করা যে ‘কার্লেত্তো’র জন্য কতটা কঠিন ছিল, এই ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত পুরো ব্রাজিল জুড়ে টেনশন ছিল তুঙ্গে। রিও ডি জেনিরোর ‘মিউজিয়াম অব টুমোরো’, যেখানে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন এই দল ঘোষণার জমকালো আয়োজন করেছিল, তার বাইরে সকাল থেকেই জড়ো হয়েছিলেন শত শত উন্মাতাল ফুটবল অনুরাগী।
হাতে রেপ্লিকা বিশ্বকাপ ট্রফি, ব্যানার আর প্ল্যাকার্ড নিয়ে সমবেত জনতা সমস্বরে চিৎকার করছিলেন: ‘ওলে, ওলে, ওলে, ওলা… নেইমার! নেইমার!’
ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, আনচেলত্তি স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই ভক্তরা এই স্লোগানে পুরো এলাকা কাঁপিয়ে তোলেন। লক্ষ্য একটাই, কোচের কানে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, নেইমারকে ছাড়া তারা অন্য কিছু ভাবতেই পারছেন না।
দল ঘোষণার আগে আনচেলত্তি বারবার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তিনি কেবল সেই খেলোয়াড়দেরই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ফ্লাইটে তুলবেন, যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ‘১০০ শতাংশ ফিট’। নিজের এই কথার প্রমাণ দিতেই গত মার্চ মাসে আমেরিকার মাটিতে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে খেলা দুটি হাই-প্রোফাইল প্রীতি ম্যাচে নেইমারকে স্কোয়াডেই রাখেননি এই ডাচ-ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড।
তবে প্রাথমিক ৫৫ জনের তালিকায় নেইমারের নাম থাকাটাই ভক্তদের মনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিল। ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ম্যাচে সেই যে হাঁটুতে মারাত্মক চোট পেয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন, তারপর থেকে দীর্ঘ আড়াই বছর দেশের জার্সিতে আর নামা হয়নি এই 'নাম্বার টেন'-এর। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ব্রাজিলের ডাগআউটে চার চারজন কোচ বদলে গেলেও চোট আর ট্যাকটিক্যাল কারণে নেইমারকে সাইডলাইনেই বসে থাকতে হয়েছে।
অবশেষে সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, ভক্তদের বন্দুকের নল আর বুক ফাটানো স্লোগানের মান রেখে আনচেলত্তি নেইমারকে তাঁর চূড়ান্ত ২৬ জনের স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফুটবলপ্রেমীদের এই বাঁধভাঙা আবেগ আর নেইমারের পায়ের জাদু মিলে এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে ব্রাজিল ভক্তদের দীর্ঘ ২৪ বছরের সোনালী ট্রফি খরা কাটাতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়। কোনো সন্দেহ নেই, এই মুহূর্তে পুরো ফুটবল বিশ্বের চোখ কেবল ব্রাজিলের ওপর!