গত জানুয়ারিতে মরক্কোর মাটিতে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালের সেই কুখ্যাত ও নজিরবিহীন হাঙ্গামার জেরে এতদিন মরক্কোর জেলে পচতে থাকা একদল সেনেগালি ফুটবল ভক্ত অবশেষে বীরের বেশে দেশে ফিরেছেন। মুসলিমদের পবিত্র উৎসব ঈদুল আজহা উপলক্ষে মরক্কোর রাজা মোহাম্মদ মানবিক বিবেচনায় রাজকীয় ক্ষমা ঘোষণা করার পর রোববার তাঁরা সেনেগালের মাটিতে পা রাখেন।
রোববার ডাকার বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষারত এই উল্লসিত ও আবেগাপ্লুত সমর্থকদের স্বাগত জানাতে স্বয়ং ট্র্যাকস্যুট পরে হাজির হয়েছিলেন সেনেগালের নতুন প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, তাঁদের আবার সেনেগালের মাটিতে ফিরে পেয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।
রাজকীয় ক্ষমার জন্য মরক্কো প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানালেও, কূটনীতির চতুর চালে মরক্কোকে একটি মোক্ষম ‘খোঁটা’ দিতে ছাড়েননি প্রেসিডেন্ট ফায়ে। মরক্কোকে রীতিমতো চটিয়ে দিয়ে তিনি তাঁর দেশের ফুটবল দলকে প্রকাশ্যেই দুই বারের আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন বলে অভিহিত করেন।
অথচ গত জানুয়ারির সেই ফাইনালের আসল চ্যাম্পিয়নশিপের ভাগ্য এখনো সুইজারল্যান্ডের ‘কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট’-এ বিচারাধীন এবং চরম আইনি বিরোধের মধ্যে রয়েছে।
এই ফুটবল যুদ্ধ ও কূটনীতির নাটকের সূত্রপাত গত ১৮ জানুয়ারি রাবাতের সেই অগ্নিগর্ভ ফাইনালে। ম্যাচটি টাইব্রেকার বা অতিরিক্ত সময়ে গড়াচ্ছিল এবং স্কোরলাইন ছিল ০-০। খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে দ্বিতীয়ার্ধের স্টপেজ টাইমে সেনেগালের একটি গোল বিতর্কিতভাবে বাতিল করে রেফারি উল্টো মরক্কোর পক্ষে একটি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ব্যস, তাতেই রক্ত মাথায় চড়ে যায় সেনেগালি সমর্থকদের।
তারা গ্যালারি থেকে মাঠে ঢোকার চেষ্টা করেন এবং একের পর এক জিনিসপত্র ছুড়ে মারেন। পেনাল্টির সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে খেলা বয়কট করে মাঠ ছেড়ে চলে যান সেনেগালের ফুটবলাররা। প্রায় ২০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকার পর তারা যখন মাঠে ফেরেন, তখন যেন ভাগ্যদেবতা তাদের সহায় ছিলেন।
মরক্কো সেই পেনাল্টি মিস করে এবং উল্টো ৯৪ মিনিটে এক দুর্দান্ত গোল করে সেনেগাল ম্যাচ জিতে উল্লাসে মাতে। যদিও পরবর্তীতে মরক্কোর আপিলের পর পুরো ম্যাচটি স্বাগতিক মরক্কোর পক্ষে দিয়ে দেওয়া হয়, যা নিয়ে এখনো আদালতে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
সেই ফাইনালের রাতে স্টেডিয়ামে হুলিগানিজম ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধে মরক্কোর একটি আদালত ১৮ জন সেনেগালি সমর্থককে তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়। এর মধ্যে তিন মাসের সাজা খেটে গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তিন জন মুক্তি পান। বাকি ১৫ জন সমর্থক মরক্কোর অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই বন্দি ছিলেন, যাদের কপাল খুলে গেল ঈদের আগমুহূর্তে রাজার এই বিশেষ ক্ষমার ঘোষণায়।
মাঠের সেই চরম মারামারি আর গ্যালারির হাঙ্গামা এবার আন্তর্জাতিক ক্ষমার হাত ধরে আইনি জটিলতা থেকে মুক্তি পেলেও, দুই দেশের ফুটবলীয় এবং রাজনৈতিক অহমের লড়াই যে এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে, প্রেসিডেন্ট ফায়ের এয়ারপোর্টের বক্তব্যেই তা পরিষ্কার।