বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। ঠিক এই মহূর্তে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও ইরান ফুটবল দলের কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ভিসা’ পাওয়ার যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সাথে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতের আবহেই এবার ফুটবলার ও সাপোর্ট স্টাফদের জন্য আমেরিকার কাছে ‘মাল্টিপল-এন্ট্রি’ ভিসার দাবি জানিয়েছে ইরান ফুটবল ফেডারেশন। ফিফা কর্তৃক ইরানের বেস ক্যাম্প বা প্রশিক্ষণ ঘাঁটি আমেরিকা থেকে মেক্সিকোতে স্থানান্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ঠিক দুদিন পর এই দাবি সামনে এলো।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ বুধবার উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে স্থানীয় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, তিনি আশা করছেন মার্কিন প্রশাসন টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাওয়া পুরো ইরানি স্কোয়াড এবং কর্মকর্তাদের সময়মতো ভিসা ইস্যু করবে। মেহেদি তাজ স্পষ্ট করে বলেন, আমেরিকার উচিত আমাদের সব খেলোয়াড়কে মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা দেয়া, কারণ খেলাধুলার প্রয়োজনে তাদের টুর্নামেন্ট চলাকালীন বহুবার আমেরিকায় ঢুকতে এবং বের হতে হবে।
মজার বিষয় হলো, বিশ্বকাপ দরজায় কড়া নাড়লেও ইরানি দলের কেউই এখনো আমেরিকার ভিসা হাতে পাননি। গত সপ্তাহে তুরস্কে অনুশীলন ক্যাম্পে থাকা দলের বেশ কয়েকজন সদস্য ভিসার জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলা শুরুর আগে যারা ভিসার আবেদন করতে পারেননি, তারা সশরীরে তুরস্কে মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে পাসপোর্ট জমা দিয়ে এসেছেন।
শুধু তা-ই নয়, নকআউট পর্বে উঠলে কানাডার ভেন্যুগুলোতে খেলতে হতে পারে, এই আগাম সমীকরণ মাথায় রেখে পুরো ইরানি দল ইতিমধ্যেই কানাডার ভিসার জন্যও আবেদন করে রেখেছে। গত মাসে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও গতকাল বুধবারই হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ড্রোন হামলা এবং জবাবে কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন তলানিতে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে এই ভিসা প্রক্রিয়ার ওপর।
ভিসা জটিলতা আর নিরাপত্তার এই চরম ধোঁয়াশার মাঝেই গত সোমবার বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা নিশ্চিত করেছে যে, ইরানের অনুরোধে তাদের বিশ্বকাপ বেস ক্যাম্প আমেরিকা থেকে সরিয়ে মেক্সিকোতে নেয়া হয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের টুসন শহরের একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্সকে নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছিল ইরান।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর তারা তড়িঘড়ি করে এই সিদ্ধান্ত বদল করে। ফিফার চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, ইরানকে এখন মেক্সিকোর টিজুয়ানা শহরের একটি স্পোর্টস সেন্টার বরাদ্দ করা হয়েছে।
মেডিক্যাল ও টেকনিক্যাল কারণে এই ঘাঁটি বদলানো হয়েছে দাবি করা হলেও, ফেডারেশন প্রধান মেহেদি তাজ আসল রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি জানান, টিজুয়ানা শহরটি মেক্সিকো-আমেরিকা সীমান্তের একদম কাছাকাছি এবং আমেরিকার সান ডিয়েগো শহরের ঠিক ওপারেই অবস্থিত।
ফলে সীমান্ত ঘেঁষা এই অবস্থানের কারণে ম্যাচ খেলার জন্য যখনই মার্কিন ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে হবে, তখন ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা ও ঝক্কি অনেকটাই কমে যাবে। ইস্তাম্বুল ও তেহরানে ফিফা কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় মিটিং ও ওয়েবিনারের পর এই অনুমতি মিলেছে।
আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত যৌথভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, গ্রুপ 'জি'-তে থাকা ইরান আগামী ১৫ই জুন ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে।
এর ঠিক ছয় দিন পর তারা মুখোমুখি হবে শক্তিশালী বেলজিয়ামের এবং ২১ জুন ওয়াশিংটন স্টেটের সিয়াটলে মিশরের বিরুদ্ধে খেলবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ। এখন দেখার বিষয়, মাঠের বাইরের এই ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ আর ভিসার লাল ফিতের ফাঁস গলে ইরানি ফুটবলাররা শেষ পর্যন্ত আমেরিকার মাঠে বল পায়ে নামতে পারেন কি না!